ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) থেকে শুরু হয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা চলবে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পর্যন্ত।
ইরান কর্তৃপক্ষ ৪ জুলাইকে শোকানুষ্ঠান শুরুর দিন হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করার মানসিকতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস এবং এ বছর দেশটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী পালন করছে। তিনিই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উস্কে দিয়েছিলেন বলে প্রচলিত আছে।
অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষ এ সময় নির্বাচনের বিষয়টি স্বীকার না করলেও, তেহরানের জনসমাগমে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগান শোনা যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, সর্বসাধারণের জন্য শ্রদ্ধাস্থল উন্মুক্ত করতেই শনিবার ভোর থেকে থমকে পড়েছে ইরানের রাজধানী তেহরান। আয়াতুল্লাহ খামেনির কম্পাউন্ডের কাছের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে তার মরদেহ। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে কালো পোশাক পরে শোকাহত মানুষজন দলে দলে নেমে এসেছেন রাস্তায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে এদিন তেহরানে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকায় ও গ্র্যান্ড মোসাল্লার আশপাশের সড়ক বন্ধ রাখায় তারা হেঁটে চলেছেন নির্ধারিত গন্তব্যে।
অনেকের হাতে দেখা যায় ব্যানার ও ইরানের পতাকা। শহরের বিভিন্ন বিলবোর্ডে প্রদর্শিত হচ্ছে আয়াতুল্লাহ খামেনির ছবি ও বীরত্বগাঁথা। গ্র্যান্ড মোসাল্লার ঠিক বাইরে পুরুষদের একটি বড় দলকে বুক চাপড়ে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শোক প্রকাশ করতে দেখা যায়। এটি শিয়া মুসলিমদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রচলিত একটি শোক রীতি।

মায়ের সঙ্গে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে আসা ২৭ বছর বয়সী নারী হানানে মোসাভি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি আমার প্রিয় নেতা আলী খামেনিকে বিদায় জানাতে এসেছি। আমি কখনো ভাবিনি এমন দিন দেখতে হবে। আমি চাইতাম এই ট্র্যাজেডির আগেই যেন আমি মারা যাই।’
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তৈরি করা উন্মুক্ত মঞ্চটি দেখেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইরানিরা। এটি ঠিক সেই মঞ্চের মতো, যেখানে খামেনি একসময় তার কমপাউন্ডের হুসেনিয়ায় বক্তৃতা দিতেন।
গত ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় কম্পাউন্ডের ওই অংশটি ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধের ওই প্রথম দিনই নিজ কার্যালয়েই হামলার শিকার হন আয়াতুল্লাহ খামেনি। পরিবারের কয়েক সদস্য ও বেশ কয়কজন সঙ্গীর সঙ্গে সেদিনই নিহত হন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির কফিনের পাশে আছে তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়েজানি, মেয়ে বোশরা খামেনি, জামাতা মেসবাহ বাঘেরি কানির মরদেহ।

খামেনির মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকেও নিয়ে যাওয়া হবে। প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী রাজধানী তেহরানে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ৭ জুলাই ইরাকের ধর্মীয় নগরী কোমে বিশেষ শোক অনুষ্ঠান করা হবে।
তেহরান, কোম, ইরাক ও মাশহাদে পাঁচদিনব্যাপী খামেনির জানাজা এবং দাফন-সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯ জুলাই তার জন্মশহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
ইরান সরকারের প্রত্যাশা, আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ঘিরে তেহরানের রাস্তায় কোটি কোটি মানুষের সমাগম ঘটবে। এর আগে ১৯৮৯ সালে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির দাফনের সময়কার জনসমাগমের মতো হবে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজ শহরেরও প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার দূর থেকে আসা আলী কাজেমি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশ ও ধর্ম রক্ষায় প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করতে এই জানাজায় এসেছি।’

বিশাল এই জনসমাগম ইরান সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক শক্তির বার্তা হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ ইরান সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের স্থায়ী সমঝোতার আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগাতে চাইছে এবং একইসঙ্গে জমাসমাগম ঘিরে ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে তার ছেলে ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনি প্রকাশ্যে জানাজায় উপস্থিত হবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে ২৫০ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাউথ ডাকোটায় মাউন্ট রাশমোরের সামনে এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করেছি। তারা সমঝোতা করতে খুবই আগ্রহী। আমরা তাদের জানাজার জন্য এক সপ্তাহ বিরতি দিয়েছি।’


