ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা গেছে ছয় নবজাতক।
স্বজনদের অভিযোগ, এসি থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ ও ওয়ার্ডের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের কারণে এই মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘দুর্ঘটনাজনিত’ বলে দাবি করেছে।
মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে বুধবার ভোরের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে নেমে আসে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া। নবজাতকদের স্বজনরা চিকিৎসায় গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা এবং ঘটনার পর তথ্য গোপনের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে সিআইডি ও পিবিআই তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠন করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এটিকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে দাবি করলেও, স্বজনদের অভিযোগ, অব্যবস্থাপনা এবং ঘটনার পর তথ্য গোপনের চেষ্টার কারণেই এই মৃত্যু। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনাস্থলে সিআইডি ও পিবিআই তদন্ত শুরু করেছে। গঠন করা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি।
যেভাবে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে ৬ শিশু
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটিতে প্রথম বিপত্তি টের পান লিপি নামের এক দায়িত্বরত নার্স। তিনি বুঝতে পারেন এসি থেকে ঠাণ্ডা বাতাসের বদলে গরম বাতাস বের হচ্ছে। এর পরপরই সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। রাত ৩টায় এসি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ভোরের দিকে মুমূর্ষু অবস্থায় ৬ জন শিশুকে ৫ তলার এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়।
জানা গেছে, ঘটনার সময় পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে মোট ১১ জন মা ভর্তি ছিলেন।
এর মধ্যে ৫ জনের নবজাতক কারণে আগে থেকেই এনআইসিইউতে ভর্তি ছিল। ১ থেকে ৩ দিন বয়সী নবজাতক নিয়ে শিশুর মা রা ওয়ার্ডেই ছিলেন। সে ওয়ার্ডের ৫ জন শিশু আগে থেকে এনআইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। ভোর বেলা এনআইসিইউতে ভর্তি করা ৬ শিশুই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
‘আমরাই শ্বাস নিতে পারি না, বাচ্চারা কীভাবে নেবে?’
হাসপাতাল চত্বরে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা অভিযোগ করেছেন চরম গাফিলতির।
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থেকে আসা মাসুদা বেগম কাঁদছিলেন তার ৩ দিন বয়সী নাতনির জন্য। সোমবার শিশুটিকে ভর্তি করানো হয়েছিল এবং ওয়ার্ডের সব শিশুই সুস্থ ছিল জানিয়ে এই দাদি টাইমসকে বলেন, ‘আগে যদি নার্স একটু জানাতো, তাহলে আমার নাতনি বেঁচে যেত। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাচ্চার নামটাও আমরা রাখতে পারলাম না।’
এক নবজাতকের মায়ের ভাগ্নে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “‘বাচ্চার মায়ের অবস্থা ভালো না। ওয়ার্ডের যে অবস্থা, জায়গাটা অনেক বেশি আটকানো, সেখানে আমরাই শ্বাস নিতে অসুবিধায় পড়ি, বাচ্চারা কীভাবে নেবে? ওপরের সিলিংগুলোও ভাঙা। মামলা করে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় বলেন?’
নিহত আরেক শিশুর চাচা মো. জাকির হোসেন জানান, শনিবার রাত ২টার দিকে তার ভাতিজার জন্ম হয় এবং মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত সে পুরোপুরি সুস্থ ছিল। ভোরে পরিবারের সদস্যরা ফোন করে শিশুর অবস্থার অবনতির কথা জানান। সকাল ৫টার দিকে তাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয় এবং কিছুক্ষণ পরই জানানো হয় শিশুটি মারা গেছে।
তিনি আর্তনাদ করে বলেন, ‘এটা তাদের প্রথম সন্তান। সব নষ্ট হয়ে গেছে।’ জাকির আরও জানান, তারা মুন্সীগঞ্জ থেকে এসেছিলেন। এর আগে তাদের পরিবারের আরও তিনটি সন্তান এই হাসপাতালেই সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল বলে তারা এখানে ভরসা করে এসেছিলেন।
স্বজনদের আরও গুরুতর অভিযোগ, শিশুর মৃত্যুর পর হাসপাতালের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। একাধিকবার ফাইল খোঁজার পরও তা পাওয়া যাচ্ছিল না। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই ঘটনার পর স্থান ত্যাগ করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম বুধবার সকালে ছয় শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কীভাবে গ্যাস লিকেজ হয়েছে এবং নিহতরা কারা, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘দুর্ঘটনাজনিত’ বলে দাবি করে। তবে চিকিৎসায় অবহেলা এবং ভিডিওতে ওঠা স্বজনদের হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে তাদের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের এডি আশরাফুল শুধু রাত ২টা থেকে ভোরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ
খবর পেয়ে রাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রব্বানী হোসেন বলেন, ‘কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন।’
রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশিক ইকবাল সকালে টাইমসকে জানান, ‘নিহত ছয়জনই নবজাতক। আজ ভোরে খুব কাছাকাছি সময় তারা মারা গেছে। দুর্ঘটনার কারণ এবং কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।’ গ্যাস লিকেজের উৎস ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বর্তমানে সিআইডি এবং পিবিআই কাজ করছে।
শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি গঠন
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান।
পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক টাইমসকে বলেন, ‘আজকে ভোরবেলায় এই কক্ষে এসি-সংক্রান্ত জটিলতা অথবা অন্য যেকোনো কারণে এখানে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি পাওয়া গেছে।’

আমরা দেখেছি, ‘এসিটি এমনভাবে ছিল যে এটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসাধীন ছয়টি শিশুকে আমরা হারিয়েছি। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে এই ঘটনা ঘটে বলে আমরা ধারণা করছি।’
তিনি আরও জানান, শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইংয়ের উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে।
অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার কোনো ত্রুটি ছিল কি না, শিশুদের চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং যে কক্ষে তারা ছিল, সেই পরিবেশে কোনো সমস্যা ছিল কি না— তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। এসি-সংক্রান্ত বা অন্য কোনো কারিগরি ত্রুটি থাকলে সেগুলোও নির্ণয় করা হবে। প্রয়োজনে কারিগরি বিশেষজ্ঞও কমিটিতে যুক্ত (কো-অপ্ট) করা হবে।’


