২০২৩ সালের দিকে একটি জামিনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আসেন রফিকুল ইসলাম। তার আত্মীয় একটি হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি। আদালতের জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় এক ব্যক্তি তার কাছে এসে নিজেকে হাইকোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। তার কথাবার্তা, আত্মবিশ্বাস এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্বাভাবিক চলাফেরা দেখে রফিক সহজেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলেন।
লোকটি জানায়, তার পরিচিত সিনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমে দ্রুত জামিন করানো সম্ভব। শুরুতে ফাইল মুভ করার অজুহাতে কিছু টাকা নেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় শুরু হয়। কোর্ট ফি, নথির নকল সংগ্রহ, বেঞ্চে মামলাটি তালিকাভুক্ত করার খরচ। প্রতিবারই একই আশ্বাস, আজই হয়ে যাবে, আগামীকাল অর্ডার আসবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। কোনো ধরনের জামিনের আবেদন আদালতে দাখিলই করা হয়নি। কোনো আইনজীবীর সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি। কয়েকদিন পর রফিক বুঝতে পারেন, তিনি দালালের খপ্পরে পড়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টসহ অন্যান্য আদালত প্রাঙ্গনে দালালের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। তারা নানা প্রলোভন দেখিয়ে মামলা ও অর্থ গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীকে সর্বশান্ত করে চলে যায়। আদালত প্রাঙ্গনে এমন দালালের খপ্পরে পড়েন বা পড়তে পারেন আইনজীবী, মক্কেলসহ অনেকেই। পর্যবেক্ষকদের মতে, দালালের উপস্থিতি ন্যায়বিচারের পথে বাধাস্বরূপ। বিভিন্ন সময়ে দালালদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত আদালত প্রাঙ্গনকে দালালমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। দালালদের কাছে বিচারপ্রার্থী এমনকি আইনজীবীরাও যেন জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, আদালত প্রাঙ্গনে দালালের উপস্থিতির বিষয়ে আমরা সচেতন রয়েছি। আইনজীবী সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্ন আদালতে এ বিষয়ে মাঝে মাঝে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষেত্রেও প্রয়ােজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
হাইকোর্টের রুল
২০২০ সালে দালাল উচ্ছদ করতে হাইকোর্ট একটি রুল জারিসহ অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশের সব আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ভুয়া আইনজীবী, টাউট, দালাল, ভুয়া মুহুরি, ক্লার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে ওই বছরের ২ মার্চ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এছাড়া আদালত একই বিষয়ে রুলও জারি করে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এ রিট দায়ের করেন। রিটে আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, বার কাউন্সিলের সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) বিবাদী করা হয়। রিটে বলা হয়, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাক্টিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২ এর ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত হতে হবে। অন্যথায় ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বার কাউন্সিল এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় আদালত অঙ্গনে টাউট-দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে।
আদালতের আদেশের পর দালাল ও টাউট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ দেশের ৬৪ জেলার আইনজীবী সমিতিতে চিঠি দেয় বার কাউন্সিল। এরই আলোকে দেশের বিভিন্ন বারে অভিযান চালানো হয়।
এ বিষয়ে আইনজীবী ফরহাদ টাইমসকে জানান, আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বার কাউন্সিল দেশের সকল আইনজীবী সমিতিতে চিঠি দেয়। কিন্তু আইনজীবী সমিতিগুলো থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা না পাওয়ায় বিষয়টি আর এগোয়নি। তবে খুব শিগগিরই হাইকোর্টে রুল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণসহ বিভিন্ন আদালতে এখনো এমন অনেক দালাল, টাউট ও ভুয়া সহকারী ঘোরাফেরা করে, যারা প্রকৃতপক্ষে কোনো আইনজীবীর সঙ্গে যুক্ত নয়, অথচ নিজেদের সেই পরিচয়ে উপস্থাপন করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তারা মামলাও রিসিভ করে থাকে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বিপজ্জনক। এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে আইনজীবীর পরিচয়, বার কাউন্সিল সনদ এবং চেম্বারের সঠিক ঠিকানা যাচাই করা ছাড়া কোনোভাবেই অর্থ লেনদেন করা উচিত নয়।
দালাল কে
এক কথায়, আইনজীবী ছাড়া তার নামে বা অন্য কোনোভাবে যে ব্যক্তি মামলা বা সম্মানী গ্রহণ করবে সেই দালাল। আইনজীবী সহকারী বা মুহুরিরও এ অধিকার নেই। এতে অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিছু এরাই অনেক সময় মামলা রিসিভ করে থাকে। এর ফলে আইনজীবীদের মর্যাদাহানি ঘটছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম বলেন, দালাল উচ্ছদ করা বিচারাঙ্গনের দায়িত্ব। দালালের কাছে প্রতারিত বিচারপ্রার্থীদের কাছে বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের সম্মান থাকে না। প্রতারিত ব্যক্তি অন্যদেরও দালাল মনে করতে থাকে। আদালত প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে যদি একজন মানুষ প্রতারণার শিকার হন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার জন্য একটি বড় হুমকি। এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি।
আইনজীবীরা জানান, যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে করা মামলাও দালালরা জামিনের শর্ত দিয়ে আসামিপক্ষের মাধ্যমে আইনজীবীর কাছ থেকে নিয়ে যায়। একটি আদালতের যে মামলা শোনার জুরিসডিকশনই নেই, সে সব মামলাও শর্ত দিয়ে ক্লায়েন্টকে প্রভাবিত করে আইনজীবীর কাছ থেকে নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের দিকে বরিশাল থেকে আসা শহীদ উদ্দিন জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) নিতে সুপ্রিম কোর্টে আসেন। আইনজীবীর ক্লার্ক পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি তাকে জানায় তিন দিনের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে। দুই দফায় এক লাখ টাকা নেন তিনি। ফাইল প্রসেসে আছে, জজ সাহেব দেখেছেন, কাল অর্ডার হবে, এ ধরনের দাবিতে সময়ক্ষেপণ চলতে থাকে। এক সপ্তাহ পর প্রকৃত আইনজীবীর মাধ্যমে জানা যায়, মামলার কোনো আবেদনই দাখিল করা হয়নি। কথিত ক্লার্কেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। সময়মতো ইনজাংশন না পাওয়ায় শহীদ তার জমির দখল হারান। সেই সঙ্গে অর্থও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দালালরা আইনজীবীর জুনিয়র, মুহুরি, আইনজীবী সহকারী, ক্লায়েন্ট, আত্মীয়-স্বজন ও আসামি সেজে আদালতপাড়ায় ঘোরাফেরা করে। আইনজীবী সমিতি ও আদালতের বিভিন্ন ফ্লোরে বিচারপ্রার্থীদের মাঝে এদের বসে থাকতে দেখা যায়। কখনো টাইপিস্টদের রুমে, ব্যাংকে, ক্যান্টিনে ও হলরুমে। কখনোবা আইনজীবীদের কক্ষে। কখনো ঢুকে পড়ে বিচারকক্ষেও। কোর্ট-টাই পরা, সুসজ্জিত ড্রেসে অনেককে দেখে বোঝারও উপায় নেই এরা দালাল।
একাধিক আইনজীবী টাইমসকে জানান, দালালরা এতটাই ‘ক্ষমতাভাবান’ যে, ক্লায়েন্টকে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ফাইল করা মামলা, এমনকি লিষ্টেট মামলাও সিনিয়র আইনজীবীদের নাম করে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন। দ্রুত কাজের লোভ দেখায়। আগাম জামিন করিয়ে কাগজপত্র বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ারও আশ্বাস দেয়। নতুন আসা বিচারপ্রার্থীদের টার্গেট করে।
ভুয়া রশিদ ও মিথ্যা আশ্বাস দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীকে নিঃস্ব করে চলে যায়। এরা অনেক সিনিয়র আইনজীবীর নাম ভাঙিয়ে তাদের নামে, চেম্বারের ঠিকানায় ভিজিটিং কার্ড পর্যন্ত ছাপেন। এভাবে একটি মামলা উচ্চ আদালতে আসতে তিন-চার ‘হাত’ বদল হয়। আর প্রত্যেক হাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিচারপ্রার্থী। যদিও সরাসরি আইনজীবীর কাছে এলে অনেক কম খরচেই বিচার পেতে পারত। এক মক্কেল জানান, আগাম জামিন আদেশের কপি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তার থেকে এক দালাল ৪০ হাজার টাকা নেন। পরে আর তিনি যোগাযোগ করেননি।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও ২০২০ সালের ২৪ জুন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ দেশের ৬৪ জেলার আইনজীবী সমিতিতে দালালি এবং টাউট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। তারই আলোকে দেশের বিভিন্ন বারে অভিযান চালানো হয়। কোথাও কোথাও টাউট-দালাল ধরাও পড়ে।
টাউট-বাটপার উচ্ছেদ নিয়ে কাজ করে আসা এবং টাউট চিহ্নিত করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, টাউট, দালাল ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি যারা আইনজীবী নন, তারা আইনজীবী পরিচয়ে অসৎ উদ্দেশ্য এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। সেটা দেশের প্রত্যেক আদালতেই কমবেশি লক্ষ্য করা গেছে। আদালত প্রাঙ্গনে দালালদের উপদ্রবে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে।
ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগে সুপ্রিম কোর্টে কুদরত-ই-খুদা নামে এক দালাল প্রকাশ্যে বিচারকের নাম বিক্রি করে মামলা গ্রহণ করতো। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রধান বিচারপতির কাছেও আবেদন করেছিলেন। অনেক চেষ্টার পরে তিনি তাকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনির হোসেন টাইমসকে বলেন, দালালরা সহজ বিষয়কে কঠিন করে তোলে, কঠিন বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করে। আইনজীবীর কাছে বিচারপ্রার্থী এলে একটি মামলা স্বল্প খরচে পরিচালনা করা যায়, দালালরা এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয় এবং প্রতারণা করে।
দালাল নির্মূল আন্দোলন
রাজশাহীর বাগমারা অঞ্চলের বৈলসিংহ এলাকার তানজিম তাসকিন আদুরী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পরিচয়ে চলাফেরা করতেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে আটক করে ২০১৯ সালের ৮ মে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়। পরদিন ফেনী সদর উপজেলার মো. ইমরান ও কিশোরগঞ্জের মো. শফিকুল বাশারকেও একই অভিযোগে আটক করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব জেলা জজ আদালত অঙ্গন থেকে টাউট, দালাল ও দুর্নীতি নির্মূল করতে কাজ করছেন একদল আইনজীবী। ২০২০ সালের ৯ জুলাই ‘আইনাঙ্গনে টাউট-দালাল-দুর্নীতি নির্মূল আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এ লক্ষ্যে ৭১ সদস্যের একটি কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
কমিটির আহবায়ক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, সাধারণ মানুষকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে আদালত অঙ্গনকে দালালমুক্ত করতে হবে। আমরা কমিটি গঠন করে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আদালত প্রাঙ্গনকে দালালমুক্ত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত অঙ্গনে টাউট প্রসঙ্গটি এত বেশি উচ্চারিত হচ্ছে যে, এই প্রসঙ্গটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করে উপায় নেই। এই দালালরা আদালতে বিচার প্রার্থীদের জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি বিভিন্নভাবে ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে অন্তরায়ও বটে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।


