টুংটাং শব্দে যেন এখনও টিকে আছে বাংলার পুরোনো এক ইতিহাস। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেও লুকিয়ে আছে হতাশা, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার লড়াই। একসময় কোরবানির ঈদ এলেই কামারপাড়ায় ঘুম থাকত না। রাতভর আগুন জ্বালিয়ে চাপাতি, ছুরি, বঁটি, ভোজালি বানাতে ব্যস্ত থাকতেন কামাররা। ঈদের আগের রাতে দোকানের সামনে থাকত ক্রেতাদের লাইন। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত।
ডিজিটাল যুগ, অনলাইন বাজার, কোম্পানির তৈরি রেডিমেড অস্ত্রপাতির প্রভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প।
বোয়ালমারীর পৌরসদরের কামারগ্রামে বংশ পরম্পরায় মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই কামারের কাজ করে আসছেন প্রবীণ কামার বিষ্ণুপদ কর্মকার। তিনি জানান, ১৯৭১ সাল থেকে বাবার হাত ধরে এ পেশায় আসি, আগে ঈদের এক মাস আগে থেকেই দা, বটি, ছুরি বানাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন আর সেই দিন নেই। মানুষ হাট বাজার থেকে এখন বিদেশি ছুরি কিনে, আবার অনলাইনেও অর্ডার দেয়।
‘আমাদের হাতে বানানো জিনিসের কদর আগের মতো নেই। এ ছাড়া কয়লা, লোহা ও শ্রমের দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী বিক্রি নেই। এখন সাধারণত মানুষ আসে অস্ত্র শান বা ধার দিতে। আগে ঈদের রাতে আগুন নিভতো না, এখন পুরাতন চাপাতি ধার দিয়েই দিন চলে’ বলেন তিনি।
বোয়ালমারীর কামারশিল্পী প্রশান্ত বিশ্বাসের কণ্ঠেও একই হতাশা, আগে ঈদের আগে রাতভর কাজ করতাম। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও কাজ নাই। আগে বারোয়ানা কাজ ছিল, এখন আছে শিকি।
তিনি বলেন, আগে মানুষ কামারের দোকানে এসে দা, বঁটি, চাপাতি বানাইতো। এখন কোম্পানির তৈরি মাল বাজারে ভইরা গেছে। অনলাইনেও সব পাওয়া যায়।
সাগর বিশ্বাস বলেন, আগে গ্রাম থেকে মানুষ অস্ত্রপাতি বানাইতে আসতো। এখন বাজার আর অনলাইনের কারণে মানুষ আর কামারের দোকানে আসে না। টিকে আছে শুধু ঐতিহ্যের জোরে।
বোয়ালমারীর কামারপাড়াগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে আগুন জ্বলছে, হাতুড়ি উঠছে-নামছে। কেউ পুরোনো চাপাতি শান দিচ্ছেন, কেউ ছুরি বানাচ্ছেন। তবে ব্যস্ততা আগের মতো নেই।
বর্তমানে বড় ছুরি ৪০০ টাকা, মাঝারি ছুরি ৩০০ টাকা, ছোট ছুরি ২০০ টাকা, চাপাতি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা, বটি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা এবং কাস্তে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমদাদুল হক লিন্জা বলেন, অনলাইনে অনেক কিছু পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু কামারের হাতে বানানো চাপাতি বা ছুরির মান আলাদা। এই শিল্পটা টিকে থাকা দরকার।


