প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকটের পর অবশেষে স্বস্তির আভাস মিলেছে। মহেশখালীর উপকূলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী মঙ্গল বা বুধবার থেকে টার্মিনালটি থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ আবার শুরু হতে পারে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি বর্তমানে চূড়ান্ত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষায় সবকিছু ঠিক থাকলে এটি পুনরায় চালু করা হবে।
আরপিজিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশ-কে বলেন, ‘মেরামত কাজ প্রায় শেষ। মঙ্গলবার থেকেই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করার আশা করছি। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে বুধবার থেকে সরবরাহ শুরু হবে।’
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা হবে। এরপর আরও দুই থেকে চার দিনের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টার্মিনালটিতে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম (টেস্ট রান) চলছে, যাতে অবশিষ্ট কারিগরি ত্রুটি থাকলে তা শনাক্ত ও সমাধান করা যায়। বিদেশি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি দল মেরামতের শেষ ধাপের কাজ তদারকি করছে।
সামিট গ্রুপ পরিচালিত বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় মহেশখালীর দুটি অফশোর টার্মিনাল মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা হয়, যা বাংলাদেশের মোট এলএনজি-ভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় অর্ধেক।
গত ২১ জুলাই দুপুরে মহেশখালীর উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিটে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল জানায়, একটি এলএনজি ট্যাংকার থেকে জাহাজ-থেকে-জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর টার্মিনালটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালুর পর এই প্রথম কোনো বড় দুর্ঘটনার কারণে দেশের দুটি অফশোর এলএনজি আমদানি টার্মিনালের একটি টানা প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকল।
টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন, সিএনজি সরবরাহ এবং আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সারা দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খায়, বহু পরিবার রান্নার গ্যাস নিয়ে সংকটে পড়ে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ সারির।
এর আগে, আরপিজিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কবির জানান, টার্মিনালটি দ্রুত চালু করতে সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল আনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিমানে করে ঢাকায় এনে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে মেরামতের কাজ বিলম্বিত না হয়।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশ আরপিজিসিএলের মজুতেই ছিল, ফলে মেরামতের কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিভিন্ন দেশের পাঁচ থেকে সাতজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ টার্মিনালটি পুনরুদ্ধারের কাজ করছেন।
পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান আরপিজিসিএল বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে, তা প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে।
মহেশখালীর উপকূলে নোঙর করা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক খাতে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত এলএনজি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশব্যাপী গ্যাস সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


