আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নাগরিক সমাজ ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করেছে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। রোববারের এ সংলাপে অংশ নিয়ে প্রতিনিধিরা আসন্ন নির্বাচনকে কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আখ্যা দেন।
তারা নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে সজাগ থাকার পাশাপাশি পোস্টাল ভোটিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও এআইয়ের অপব্যবহার রোধে কার্যকর কৌশল নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ছাড়া সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে না যাওয়ার পরামর্শ দেন অংশগ্রহণকারীরা। সংলাপে বক্তারা আগের নির্বাচন কমিশনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বর্তমান কমিশনকে সতর্ক করেন। তাদের মতে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির সাহসী, স্বাধীন ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি। বক্তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন-কোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে আদৌ সেরা নির্বাচন আয়োজন সম্ভব কি না।
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ইসির প্রতি আমাদের আস্থা আছে কি না, তার চেয়ে বড় কথা হলো বর্তমান নির্বাচন কমিশন মনে করে কি না যে বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। যদি মনে করে তাহলে পরবর্তী নির্বাচনের দায় নিতে হবে। আর যদি মনে না করে তাহলে আগামী পাঁচ মাসে সরকারের কী করা উচিত তা জনসম্মুখে জানাতে হবে। তাহলে ইসির প্রতি জনআস্থা আসবে।
তিনি বলেন, আপনাদের যেমন নির্বাচন করার মানসিকতা থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচন না করার মানসিকতাও থাকতে হবে। যদি মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তাহলে নির্বাচন থেকে সরে আসা উচিত, আপনাদের পদত্যাগ করা উচিত। বিগত ইসিকেও একই কথা বলেছিলাম।
কিছু দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার প্রস্তুতি চলছে। একটি পক্ষকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। ঐকমত্য কমিশনে ৩০টি দলের সঙ্গে কথা হচ্ছে। সেখান থেকেও কেউ যদি বলে নির্বাচনে যাবে, তাহলে পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়টা ভাবতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, সেরা নির্বাচন হবে। তাহলে কাউকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেরা নির্বাচন কীভাবে হবে, যোগ করেন তিনি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ইসি অনেক কাজ করেছেন। তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে নবীন-প্রবীণ, ধনী-গরিব সবার কথা মনে রাখতে হবে, যেন ভুলে না যাই। আস্থার সংকট লৈতরি হয়ে গেছে। নারীর বিষয়ে প্রচণ্ড রকম ক্ষোভ রয়ে গেছে। ৫১ শতাংশ নারী, অথচ আসন ৫-৭ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব। আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমাদের ন্যূনতম দাবি-৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘নারীদের নির্বিঘ্ন ভোটের পরিবেশ থাকতে হবে। আশা করবো ইসি বিষয়টা নিশ্চিত করবে। প্রতিবন্ধীদের ভোটাধিকার ও ভোট দেওয়ার সুপরিবেশ রাখতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘অনেক অর্জন থাকার পরও আমরা খুব দুঃখী ও দুর্ভাগা। কারণ, আমরা এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করতে পারিনি। কেন একটি জাতি ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়? যে রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না, সে জাতি ব্যর্থ হয়।’
বাংলাদেশের সাবেক তিনজন প্রধান বিচারপতির পরিণতি আপনারা দেখেছেন। একজন প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্টের আগে। আরেকজনকে মব করে বের করে দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্টে। আরেকজন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এখন কারাগারে। আপনারা সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতিও দেখেছেন, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, সংসদ–বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু নেই। পুলিশের ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। এমন অবস্থায় কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ, যদি মেরুদণ্ড থাকে, যদি সাহস থাকে, তবেই স্বাধীন হতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘গত ২০ বছরে সমস্ত পেশা-শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি-কালিমালিপ্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকটি পেশার মর্যাদা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। সব ভেঙে গেছে। কারো প্রতি কারো কোনো আস্থা বা বিশ্বাস নেই। গতবারও এসেছি, বলেছি। তারা কিন্তু সেই সাহস, মেরুদণ্ড দেখাতে পারেননি।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, সবচেয়ে বড় চালেঞ্জ ও অর্জনের বিষয় হচ্ছে সফলভাবে নির্বাচন করা। দেশের জন্য এটা ট্রানজিশন, এর সফলতার উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে। ৭০ এর নির্বাচন যেমন টার্নিং পয়েন্ট ছিল, এবারের নির্বাচনটিও টার্নিং পয়েন্ট হবে।
তিনি বলেন, ইসিকে উঁচু নৈতিক মানদণ্ডে দেখতে চাইবে মানুষ। দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচন মানুষের প্রত্যাশা। মানুষ কী চায়, কোন উঁচুতে উঠতে হবে ভাবতে হবে, পারসেপশনও দেখতে হবে। এখনকার জটিল প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু নির্বাচন করা প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমার উপলব্ধি এবারের নির্বাচনে ক্যাম্পেইন সোশাল মিডিয়ায়, অনলাইনে হবে ৮০ শতাংশ । এটার জন্য ইসি কতটুকু প্রস্তুত? মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, এআই জেনারেটেড তথ্য আসবে। নির্বাচনের আগেই অনেক উত্তেজনা করবে সোশাল মিডিয়া।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বলেন, ‘এমন একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, বলতে হবে ভয়াবহ পরিস্থিতি। গেল ১৫-২০ বছরে প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের কার্নিশে। এমন ভায়বহ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারলে ইতিহাসের পাতায় ইসির নাম লেখা থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘পোস্টাল ভোটিং নতুন চ্যালেঞ্জ। বিতর্কিত হওয়ার অনেক সুযোগ। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আচরণবিধি প্রতিপালনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে নির্বাচন কিছুটা শান্তিপূর্ণ হতে পারে। সরকার পরিবর্তন হলেও আমলাতন্ত্র পরিবর্তন হয়নি উল্লেখ করে তিনি জানান, ইসির অনেক লোকবল রয়েছে, যারা প্রশিক্ষিত। আমলাদের বাইরে রেখে নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।’
টিআইবি পরিচালক বদিউজ্জামান বলেন, ‘হলফনামার তথ্য যাচাই বাছাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা ও আচরণবিধি প্রয়োগের দুর্বলতা রয়েছে। নির্বাচনী ব্যয় তদারকি ও প্রকাশের বিষয়ে ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিষয়ে (পরিশোধ/তফসিল করা) মনোনয়নপত্র জমার আগের দিন পর্যন্ত সময় দেওয়ায় তারা উৎসাহিত হবে। নতুন প্রস্তাবে আমরা পেছনে ফিরে যাচ্ছি, প্রকারান্তরে ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করা হবে। না ভোটের বিধান শুধু একক প্রার্থীর আসনে নয়, সব আসনে ব্যবস্থা রাখা জরুরি।’
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আব্দুল ওয়াজেদ বলেন, ‘ইসি কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসন কমান্ড ও কন্ট্রেল করা খুবই ইম্পর্টেন্ট নির্বাচন পরিচালনার জন্য। ভোটের সময় অভিযোগ সামাল দিতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পরিবর্তে ইসি কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ‘মুখে একটা মনে একটা, আমার ভীষণ খারাপ লাগে। যে দলমত পথের হোক না কেন আপনার, সুষ্ঠু নির্বাচনের সংকল্প থাকতে হবে।‘
বিজিএমইএ পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনি জানান, মেরুদণ্ড শক্ত-মেরুদণ্ডহীনের কথা বলেছে অনেকে, সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো গেলে ভালো নির্বাচন দিয়ে ইসি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে পারবেন।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জায়িফ রহমান জানান, নির্বিঘ্ন ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ইসি দৃশ্যমান উদ্যোগ নিলে জনগণের মধ্যে ভরসা বাড়বে ইসির প্রতি। মিস ইনফরমেশন, এআই জেনারেটেড তথ্যের অপব্যবহার রোধে তৎপরত থাকার অনুরোধ এ শিক্ষার্থীর।
স্বাগত বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এন নাসির উদ্দিন বলেন, আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে এ সংলাপ ভূমিকা রাখবে আশা করি। অনেক কাজ শেষ করেছি। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার পাশাপাশি আইনি সংস্কার করেছি। সুষ্ঠুভাবে ভোট করার জন্য অনেক এগিয়ে গেছি।
প্রবাসীদের জন্য আইটি সোপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং এর উদ্যোগ তুলে ধরেন তিনি জানান, সেই সঙ্গে দেশের ভেতরে ভোটে নিয়োজিত ১০ লাখের বেশি লোকবলের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি কর্মকর্তা, আইনে হেফাজতে থাকা লোক ভোট দিতে পারবে। যা এবার মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সমাপনী বক্তব্যে নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে চাই। সবাই যাতে দেখতে পারে সে ব্যবস্থা করতে চাই। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করার।‘
সিইসি বলেন, অনেকের ফোন কল ধরি না। কল ফাঁসের ভয়ে ফোনে কথা বলি না। কিন্তু আমাদের দরজা খোলা। যেকোনো সময়ে আপনাদের সুপারিশ আমরা গ্রহণ করব।


