গায়েব করা ডিজিটাল আলামত উদ্ধার ছিল বড় চ্যালেঞ্জ

গায়েব করা ডিজিটাল আলামত উদ্ধার ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ অনুসন্ধান কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছেন। তার তদন্তের অন্যতম দিক হচ্ছে অপরাধের ফোনালাপ, ছবি, ভিডিও ফুটেজের মত ডিজিটাল ডেটা বা ফুটপ্রিন্ট সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ। কিন্তু অপরাধীরা পালানোর আগেই সব আলামত ধ্বংস বা মুছে ফেলেছিলেন। তাহলে কিভাবে সেসব আলামত উদ্ধার করলেন তানভীর হাসান জোহা?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ের করা প্রথম একটি মামলার রায় দেবে, যার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অপরাধ প্রমাণে এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তানভীর হাসান জোহার উদ্ধার করা আলামত। ঐতিহাসিক এই রায়ের আগে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন টাইমস অব বাংলাদেশের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর এম আবুল কালাম আজাদ।

আজাদ: এই মামলার তদন্তে আপনি নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। তদন্তকালে অপরাধের তথ্যপ্রমাণগুলো কীভাবে সংগ্রহ করেছেন?

জোহা: জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পালানোর আগে সকল আলামত ধ্বংস করে গেছেন। কিন্তু তারা সার্ভার সরাতে পারেননি। ক্লাউডেও সেগুলোর ব্যাকআপ রয়ে গেছে। সেখান থেকেই ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক্স আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ধরনের আলামত মূলত বিটিআরসি, এনটিএমসি, ডিএমপি, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এবং ডিবিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে থাকার কথা। যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফোনের কল রেকর্ড করত এনটিএমসি। প্রধানমন্ত্রী যাদের সঙ্গে কথা বলতেন, সেই কললিস্টও সেখানে থাকত। এই প্রতিষ্ঠান থেকে সেসব ভয়েস ও কললিস্ট মুছে ফেলা হয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও ছিল একই রকম। পরে প্রতিষ্ঠানগুলোর অডিট লগের সমন্বয়ে তথ্যগুলো উদঘাটন করা হয়।

আন্দোলন দমনে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার হয়েছে। এরই মধ্যে ড্রোনগুলো জব্দ করে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া হয়েছে। ড্রোনের ফুটেজগুলো পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে দেওয়া হয়েছে।

সার্বিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে যে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর যেসব ব্যক্তি সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন, তাদের কল রেকর্ড, অডিও ক্লিপ সবকিছুই সংগ্রহ করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এসব আলামত থেকে দেখা গেছে, আন্দোলনকারীদের উপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার পরিকল্পনা করেছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক। এই পরিকল্পনা লুফে নিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর পর এটিকে ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ হিসাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন তিনি। তদন্তে র‌্যাবের হেলিকপ্টারে ভারী অস্ত্রশস্ত্র বহনের নথিও পাওয়া গেছে।

আজাদ: আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে শেখ হাসিনা, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচ রকম অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর যৌক্তিকতা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

জোহা: পাঁচ রকম অপরাধের প্রথমটি হচ্ছে গণভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স। সেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের কঠোরভাবে দমনের কথা বলেছেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তিনি আন্দোলনকারীদের দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছেন। কারণ তখনও তারা জানতেন না যে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন।

একারণে সাভার এবং যাত্রাবাড়ীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সাভারে যে ছয়টা লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, তার ভিডিও আলামতও আদালতের কাছে আছে।

আরও পড়ুন

আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী অস্ত্রের গুলিতে নিহতের পাশাপাশি অনেকে আহত হয়েছেন। এমন গুলিবিদ্ধরা এই মামলার সাক্ষী হয়েছেন। তারা শেখ হাসিনাকে সরাসরি গুলি করতে দেখেননি। কিন্তু শেখ হাসিনার নির্দেশনাতেই তাদের উপর গুলি করা হয়েছে, মামলার তদন্ত কর্তৃপক্ষ সেই আলামত জমা দিয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশের প্রমাণ হিসাবে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড রয়েছে।

এছাড়াও প্রাণঘাতী অস্ত্র থেকে গুলি করার হিসাব ও এর ফলে হতাহত সম্পর্কে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীকে এসএমএস করে জানিয়েছেন। সেই আলামতও আদালতে দেওয়া হয়েছে।

আজাদ: এই মামলার আলামত হিসাবে যেসব ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে সেগুলো অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করেন?

জোহা: ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত যেকোনো দেশে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হয়। এই মামলায় যেসব আলামত জমা দেওয়া হয়েছে, সেসব সাক্ষীদের মাধ্যমে অকাট্য হিসাবে প্রমাণ করা যায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে এসব আলামত পরে তৈরি করা নয় তো? তদন্ত কর্তৃপক্ষ সেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখেনি। সকল তথ্যউপাত্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে উন্নত মানের সফটওয়্যার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সেটা বিশ্লেষণ করে মতামত দিয়েছেন।

এছাড়া রাজসাক্ষীও বেশিরভাগ তথ্যউপাত্তকে সঠিক বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই তদন্ত কর্মকর্তা হিসাবে এসব আলামত অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করি।

আজাদ: কিন্তু সাবেক সরকারের অনেক নেতারা এসবকে তো এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছে?

জোহা: এগুলো জেনুইন। আর কেউ প্রমাণ করতে চাইলে সহজেই করতে পারবে। সেটার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা রয়েছে। বিবিসি ও আল জাজিরার বিখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন করার সময় এসব তথ্যউপাত্ত পরীক্ষার জন্য ইয়ার শটস এবং টেক গ্লোবালের সহায়তা নিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে কল রেকর্ডগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তৈরি না।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠস্বরটি ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান জঙ্গি মামলার সময়ের নির্দেশ। কিন্তু তিনি ফেসবুক থেকে কথাটা ডিলিট করে দেন। এতেও বোঝা যায়, সজীব ওয়াজেদ জয় শেষ পর্যন্ত এই কণ্ঠস্বর জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালীন বলে মেনে নিয়েছেন।

আমি মনে করি, বিশ্বের যেকোনো আদালতে যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া আলামতগুলো ক্রসচেক করা হয়, আমি নিশ্চিত ফলাফল একই রকম হবে।

আজাদ: এসব তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আপনারা ট্রাইব্যুনালের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে বলে মনে করেন?

জোহা: আমরা একরকম যুদ্ধ করে যেসব পরিমাণ তথ্য ও প্রমাণ উদঘাটন করেছি, আদালত সেগুলো আমলে নেবে বলে আশা করছি। প্রসিকিউটররাও আশা করছেন সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।

আজাদ: সর্বোচ্চ শাস্তি বলতে আমরা ফাঁসি মনে করি। আরেকটি হচ্ছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আপনার কি মনে হয় দুই ধরনের শাস্তিই হতে পারে?

জোহা: এটা বিচারকদের বিষয়। উনারা যেটা ভালো মনে করেন। আমরা তো সর্বোচ্চটা চাচ্ছি। তবে শেখ হাসিনা সন্দেহাতীতভাবে তিনটি অপরাধের দায়দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারবেন না। সেগুলো প্রমাণের পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটো অপরাধের বেলায় হয়তো ডিজিটাল আলামত অতটা শক্তিশালী না। সেখানে হয়তো কিছু তারতম্য ঘটতে পারে।

আজাদ: শেখ হাসিনা ছাড়াও তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) এই মামলার আসামি।

জোহা: সাবেক আইজিপি রাজসাক্ষী হয়েছেন। রাজসাক্ষীর সাজার বিষয়টি আদালত বিবেচনা করবে। হয়তো রাজসাক্ষীর ক্ষেত্রে শাস্তি কিছুটা হ্রাস হতে পারে। তবে সেটা একান্তই আদালতের বিবেচনার বিষয়।

আরেকটি বিষয়, সাবেক আইজিপি’র কমান্ডের উপরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কমান্ড করেছেন। একারণে আইজির কথা কেউ শুনেছে, কেউ শোনেনি। মূলত পুরো জিনিসটা শুরু করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী, উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এদেরকে আমরা গ্যং অব ফোর বলেছি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad