২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি) বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম শওকত আলী। সম্প্রতি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ভিত্তিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে বিইউবিটি। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে কথা হয় উপাচার্যের।
টাইমস: উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্তিতে অভিনন্দন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন?
উপাচার্য: ওয়ান্ডারফুল। এক কথায় খুবই ভালো অভিজ্ঞতা। স্মার্টনেস, ড্রেস-আপ, গেটআপ, ক্রিয়েটিভিটি সব দিক থেকে শিক্ষার্থীরা অনেক এগিয়ে। আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, সেই তুলনায় অনেক চেঞ্জ (পরিবর্তন) এসেছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের কমিউনিকেশন পাওয়ার অনেক বেশি। ওরা ট্যালেন্টেড এবং ফিউচারিস্টিক। এক কথায়, এই প্রজন্ম টোটালি ডিফরেন্ট- ‘কমিউনিটি উইথ আনলিমিটেড পাওয়ার’।
টাইমস: আপনি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, কোরিয়া ও ফিজির মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। সেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত এক বছরে বিইউবিটি’র অভিজ্ঞতার তুলনা করলে কীভাবে করবেন? এখানকার সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জগুলো কেমন?
উপাচার্য: উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমের অনুমতি নেই। ওদের স্টুডেন্ট ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী। বিইউবিটি’তে এই কালচারটা রয়েছে। এটা আমি পছন্দ করি। বিইউবিটি রাজনীতি ও ধূমপানমুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীদের কোয়ালিটি বিকাশের জন্য বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসের ব্যবস্থা আছে। ক্লাবগুলো খুবই সক্রিয়।
আমি সব সময় মনে করি ব্যক্তি পর্যায়ে উন্নয়ন ঘটলে জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ঘটবে। তাই বিইউবিটিতে বিভিন্ন ক্লাবভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্যেমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোয়ালিটি বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
টাইমস: লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্কিল বাড়াতে আর কোন বিষয়গুলোতে আপনি প্রধান্য দিয়েছেন?
উপাচার্য: আমাদের কালচারাল ক্লাব, আইটি ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ক্লাব ও ডিবেট ক্লাব খুবই শক্তিশালী। বিতর্কে তো ন্যাশনাল লেভেলেও আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কয়েকবার। ক্লাবগুলোর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গত বছর ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় ইউনিভার্সিটি, এটা কিন্তু অনেক।
গত বছর ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসের আশেপাশের সিগন্যালগুলোতে ট্রাফিক কন্ট্রোলের কাজ করেছে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ক্লাব। শীত বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায় এই ক্লাবের সদস্যরা।
আমরা ‘আইসিপিসি এশিয়া ঢাকা রিজিওনাল কনটেস্ট ২০২৫’ আয়োজন করছি। বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ ৬৪ জেলা থেকে পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ইভেন্টে অংশ নেবে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটির যোগাযোগ গড়ে উঠবে।
টাইমস: আপনাদের গ্র্যাজুয়েটদের সাফল্যের হার কেমন? পাস করে বের হওয়ার পর তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ব্যাপারে কতখানি সফল এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো তথ্য রাখে কিনা?
উপাচার্য: আমরা ‘সেলঅ্যাবল গ্র্যাজুয়েট’ তৈরির চেষ্টা করছি। আপনি ১০ হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করলেন, এর মধ্যে ৮ হাজারই চাকরি পেলো না, এটা সমাজের জন্য বিশাল ক্ষতি। শিক্ষাকে ‘ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড’ করতে হবে।
আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলি, বিশেষভাবে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে। তারপর তাদের শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করি। এটি একজন শিক্ষার্থীকে নিজেকে অ্যাসেসমেন্ট করতে শেখায়। বাইরের দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের ‘ইন্ডাস্ট্রি-রেডি’ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে তৈরি করা হয়, সেই দিকটাতে গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা।
অ্যালামনাইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সার্ভিস লাইফের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় আপডেট থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবন মূল্যায়নের জন্য এটি জরুরি। তাই আমরা অ্যালামনাই গঠনের জন্য সম্প্রতি কনস্টিটিউশন পাস করেছি। শক্তিশালী অ্যালামনাই গঠনের মাধ্যমে আমরা একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি।
টাইমস: কম খরচে ভালো শিক্ষার প্রচারণা চালায় বিইউবিটি। অন্যান্য ইউনিভার্সিটির তুলনায় এই খরচের পরিমাণ আসলে কেমন?
উপাচার্য: গত বছর শিক্ষার্থীদের জন্য ২৫ কোটি টাকার বৃত্তি দিয়েছি আমরা, এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার। এখানকার (বিইউবিটি) খরচটা অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আসলেও অনেক কম। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের বিশেষ ধন্যবাদ জানাই আমি।
আমরা যে পরিমাণ বৃত্তি দেই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এত বৃত্তি দেওয়া হয় না। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সাবসিটি দেয় সেই দেশের সরকার। সাবসিটি দিয়ে বিভিন্ন দেশের টপারদের নিয়ে সেখানে রেখে দেয় তারা।
টাইমস: শিক্ষার্থীদের বৃত্তির বিষয়টি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
উপাচার্য: অনেক ক্ষেত্রে শতভাগ বৃত্তি দেই আমরা। বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার দুটিতেই সিজিপিএ ফাইভ থাকলে, ভর্তির পর সেমিস্টার পরীক্ষাগুলোয় জিপিএ ফোরের মধ্যে ফোর পেলে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা এর অন্তর্ভূক্ত। এছাড়াও স্পোর্টস অ্যান্ড কালচারাল ফিল্ডে ভালো পারফর্ম করা শিক্ষার্থীদের এখন শতভাগ বৃত্তির আওতায় আনার একটা প্রক্রিয়া চলছে।
আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া কেউ যদি মেধাবী হয়, তখন আমরা তাদের জন্যও বৃত্তির ব্যবস্থা করি।
টাইমস: গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ। আপনাদের এরকম কোনো অর্জন আছে কিনা যা থেকে মানুষ উপকৃত হতে পারে?
উপাচার্য: উদ্ভাবনের কথা যদি বলেন, আমার সামনে রাখা ‘স্মার্ট ট্রু কলার’ টি কিন্তু আমরাই বানিয়েছি।
এছাড়াও আইটি এবং ট্রিপল-ই ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে অন্ধদের জন্য আমরা একটা ‘ইন্টিগ্রেটেড কম্পিউটার’ তৈরি করছি। এটা ইন্ডিয়া এখন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। কিন্তু আমরা মাত্র ৫০ হাজার টাকায় এই পণ্য দেবো।
যারা মাছ চাষ করেন, তাদের পুকুরের পানির হেল্থ মনিটর করার জন্য এআই-বেজড টুলস তৈরি করছি আমরা। পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে এটি অটোমেটিক্যালি তা ডিটেক্ট করবে। এরপর অক্সিজেন ট্যাবলেট শ্যুট করবে পানিতে। ভবিষ্যতে বাজারজাতকরণের পরিকল্পনা থেকেই এসব উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিচালনা করছি আমরা।
এছাড়া কিউ ১,২,৩ ও ৪ ক্যাটাগরির আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পুরো খরচ বহন করে। এছাড়া কিউ ১ জার্নালে লেখা প্রকাশ হলে গবেষককে ৩০ হাজার টাকা ইনসেনটিভ দেওয়া হয়।
টাইমস: শিক্ষার্থীরা কি এসব গবেষণাপ্রবন্ধ লিখছেন?
উপাচার্য: এখন পর্যন্ত গবেষণাগুলো শিক্ষকরাই পরিচালনা করছেন। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার কাজ শিখছেন।
এসব কারণেই কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে এবার দক্ষিণ এশিয়ায় ৪৫৪ নম্বরে এবং এশিয়ায় ১৪০১ থেকে ১৫০০ এর মধ্যে উঠে এসেছে বিইউবিটি। আগামী বছর এটা আরো অনেক এগিয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমরা চমকে দেবো। সেভাবেই কাজ করছি আমরা।
টাইমস: বেশিরভাগ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ব্যাপারে জনমনে একটা ধারণা আছে যে, লেখাপড়ার মান ভালো না। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
উপাচার্য: আমি বলতে চাই- ‘মাই গ্রাজুয়েটস আর ডিফরেন্ট ফ্রম আদারস’। এবং আমি যেন এটা সবসময় মাথা উঁচু করে বলতে পারি, সেভাবেই পরিকল্পনা করে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীরা গ্র্যাজুয়েশন শেষে ‘ইন্ডাস্ট্রি রেডি’ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।
ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি স্কিল বাড়ানোর জন্য আমরা বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। একারণে সম্প্রতি আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি অস্থায়ী সেন্টারের অনুমোদন পেয়েছি। সফল হলে এটি এখানে পার্মানেন্ট হবে।
এআই’কে প্রোডাক্ট লেভেলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জব মার্কেটকে টার্গেট করে দেশের প্রথম ‘ফ্যাকাল্টি অব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ খুলছি আমরা।
টাইমস: আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরির কথা বলে বিইউবিটি। এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন?
উপাচার্য: ২০২৭ সালে আমরা নার্সিং ডিপ্লোমা পড়ানো শুরু করবো। ডিপ্লোমা কমপ্লিট করার আগেই শিক্ষার্থীরা যাতে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করে ‘আইইএলটিএসে’ ভালো স্কোর করতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে। সেভাবেই কারিকুলাম সাজানো হচ্ছে। এই সেক্টরে আমরা ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ডের গ্র্যাজুয়েট এক্সপোর্ট করতে চাই। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যে পরিমাণ নার্স নিবে, সেটা দিয়েই শেষ করা যাবে না।
দক্ষ নার্সের পর আমরা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টও এক্সপোর্ট করব। বাইরের দেশগুলোতে সনোগ্রাফার, এক্সরে মেশিন অপারেটরদের ডিমান্ড অনেক। এডুকেটেড স্কিল এক্সপোর্ট করলে রেমিট্যান্স আয় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
এছাড়া আমরা প্রতিটি ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীদের ক্লাস কার্যক্রমের পাশাপাশি এমনভাবে কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসে সম্পৃক্ত করি, যাতে তারা অন্তত রিসার্চটা শিখে ফেলে। রিসার্চ জানলে কমিউনিকেশনটা সহজ হয়ে যায়। জাতীয় পর্যায়েও ‘ইন্ডাস্ট্রি-রেডি’ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।


