জনপ্রিয় গায়ক ও ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে জীবনের তিন দশক কাটিয়েছেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। শনিবার স্বামীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীর আগে স্মৃতিচারণ করলেন সেই যুগল জীবনের নানা মুহূর্ত। কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েও পড়েন তিনি।
চন্দনা বলেন, ‘তার সঙ্গে তো আনন্দ-দুঃখের অনেক স্মৃতি। তাকে হারানোর মুহূর্তে তো কোনো আনন্দের কথা মনে পড়বে না। এরপরও যদি বলি, সে পরিবারকে খুব পছন্দ করত। ব্যস্ততার মধ্যে যতটুকু সময় পেত, আমাদেরকে দিত। তার স্মৃতিতেই এখনো বেঁচে আছি।’
বাসায় থাকলে আইয়ুব বাচ্চু বেশিরভাগ সময় বিশ্রাম নিতেন বলেন জানালেন চন্দনা। তিনি বলেন, ‘যদি ভালো কিছু রান্না হত খুব মজা করে খেতো সে। বাচ্চাদেরকে খুব ভালোবাসত। ওদের সঙ্গে অনেক মজা করত।’
এসব কথা বলতে গিয়েই গলা ধরে আসে তার। তখন মনে পড়ে যায় আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়-প্রেম-পরিণয়ের কথা।
সেই স্মৃতিচারণ চন্দনার জন্য কষ্টের। আর তাই মনে করিয়ে দিলেন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের কথা, যেখানে বাচ্চু নিজের মুখেই বলেছিলেন এ গল্প।
সেখানে বাচ্চু বলেছিলেন, ‘প্রথম যাকে পছন্দ করেছি, তাকেই বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রীকে আয়নার সাথে লাগানো তার একটি ছবি দেখে পছন্দ করেছিলাম। সরাসরি দেখিনি। আমার এক বন্ধুর বাসায় যাই, বন্ধুর স্ত্রীর খুব ক্লোজ বান্ধবী ছিল চন্দনা। ছবি দেখে আমার বন্ধুর স্ত্রীকে বললাম, “এটা তো আমার স্ত্রী”।’
এরপর এক মাসের চেষ্টায় চন্দনার সঙ্গে দেখা হয় আইয়ুব বাচ্চুর। কিন্তু প্রথম দেখায় তাকে না করে দিয়েছিলেন চন্দনা।
কেন মানা করে দিয়েছিলেন জানতে চাইলে চন্দনা বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে কথাগুলো শেয়ার করতে।’
আমরাও কথা না বাড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। এরপর কথা হয় এবি কিচেন এবং এবি ফাউন্ডেশন নিয়ে।
‘এবি কিচেন ইউটিউব চ্যানেলটা তো তার নিজের হাতে তৈরি করা। সেখানে তার গাওয়া, সুর করা গানগুলো একে একে আপলোড করছি। আর ফাউন্ডেশনটা মাত্র শুরু করলাম আমরা,’—বলেন চন্দনা।
তিনি জানান, ফাউন্ডেশন থেকে বেশ কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে একটা ক্যাফের মত করা, যেখানে বাচ্চুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, গিটার থাকবে। সেখানে তরুণ প্রজন্ম এসে গানের চর্চা করতে পারবে, বাচ্চু সম্পর্কে জানতে পারবে।
চন্দনা বলেন, ‘আমরা তো তার জন্মদিনে (১৬ আগস্ট) ঘোষণা দিলাম। অনেক কিছু করার ইচ্ছে আছে। আস্তে আস্তে সব জানাব।’
ফাউন্ডেশনটার স্থায়ী অফিস নিয়ে কথা বলেন চন্দনা। তিনি বলেন, ‘ও তো চার-পাঁচটা বাড়ি রেখে যায়নি। যেটা থেকে একটাতে ওর স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করতে পারি। আবার কারও কাছে গিয়ে চাইতেও পারি না। কেউ যদি নিজে থেকে এগিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে অবশ্যই নেব। আমি চেষ্টা করছি তার অগণিত ভক্ত আছে তাদের কাছে বিষয়টা পৌঁছতে।’
নিজ হাতে আইয়ুব বাচ্চু গড়েছিলেন ব্যান্ড দল ‘এলআরবি’। দলটি এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। এ ব্যাপারে চন্দনা বলেন, ‘ওতো (আইয়ুব বাচ্চু) দলটাকে নিজের সন্তানের মত করে দেখত। ও চলে যাওয়ার পর বিভিন্নজন নানাভাবে ট্রাই করছে। আপাতত শামীম ও মাসুদ আছে আমার সঙ্গে।’
কপিরাইট অফিসের সহায়তায় আইয়ুব বাচ্চুর গানগুলো সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে abkitchen.org নামে একটা ওয়েব সাইট চালু করা হয় ২০২০ সালে। যেখানে শুরুতে বাচ্চুর গাওয়া ও সুর করা ২৭২টি গান রাখা হয়। চন্দনা জানান, সাইটটি তারা নিয়মিতই আপডেট করছেন।
অনেকে আইয়ুব বাচ্চুকে ভালোবেসে তার গান কভার করতে চায় কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চন্দনা বলেন, ‘যারা তাকে উৎসর্গ করে গান কভার করছে তাতে আমরা কোনো বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু যারা সে গান বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে, সেখানে আমরা কথা বলছি। অবশ্যই তাদের তো সেখান থেকে আয়ের একটা অংশ আমাদেরকে দিতে হবে। এ নিয়ে আমাদের সঙ্গে সবসময় একটা আইনি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।’
আগামী বাচ্চুর গাওয়া ও সুর করা পাঁচটি অপ্রকাশিত গান আসবে বলে জানালেন চন্দনা। তিনি বলেন, ‘বাচ্চুর অনেক অপ্রকাশিত গান রয়েছে। ও তো অনেক অভিমানী ছিল। অনেক গান আর নানা কারণে প্রকাশ করেনি। সেগুলো আমরা আস্তে ধীরে প্রকাশ করব।’


