অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচি নতুন সরকারের অধীনে কতটা এগোবে, তা নিয়ে স্পষ্ট রোডম্যাপ চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঢাকা সফরে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে সংস্কারের ধারাবাহিকতা, সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার লিখিত রূপরেখা চেয়ে বসেছেন।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গভর্নরের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে তিন ডেপুটি গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঋণ চুক্তির সময় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেও পরে আইএমএফ তাতে কাটছাঁট করে নতুন শর্ত যুক্ত করে। কিস্তিতে ঋণ ছাড়ের সময় সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নই মূল্যায়ন করা হয়। এখন নতুন সরকারের অধীনে সেই ধারাবাহিকতা থাকবে কি না, সেটিই জানতে চেয়েছে সংস্থাটি এবং এজন্য নতুন রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকি বলেন, ‘তারা একটি রোডম্যাপের মতো প্রতিবেদন চেয়েছে —কোন কাজ কখন এবং কীভাবে করা হবে, এর লিখিত ধারণা।’
একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণ প্যাকেজ গ্রহণ করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে।
করোনার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সময়ে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়। বাড়তি আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক লেনদেনে সংকট দেখা দেয় এবং সেই সময় আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে। এসব কারণে রিজার্ভের ব্যাপক পতন ঘটে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অন্তত ১০টি গ্রুপের অর্থপাচারের তদন্ত শুরু হয়। একই সময়ে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেন। পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এ সময় খেলাপি ঋণের হার বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে উঠে যায়।
কমপক্ষে দেড় ডজন ব্যাংকের ওপর বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। তবে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং টাকার মান কমানো নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় করছাড় কমানোর চাপও ছিল।
এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অনমনীয় অবস্থান নিলে আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড়ে সময় নেয়। পরে সংস্থাটি জানায়, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী অর্থ ছাড় করা হবে। সেই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আলোচনায় বসেছে দুই পক্ষ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, আগের পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানে আনতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংকের সুশাসন ফেরাতে নেওয়া উদ্যোগ কীভাবে চলবে, সেটিও জানতে চায় আইএমএফ।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশে না নামা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। তবে ব্যাংকিং খাতের চাপ, বৈদেশিক লেনদেনে অস্থিরতা এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় রিজার্ভ ধরে রাখতে নতুন করে বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এপ্রিল মাসে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়গুলো আলোচনায় আছে। আমরা স্প্রিং মিটিংয়ে ওয়াশিংটনে যাচ্ছি, সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে প্রথমে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে, যা পরে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে দেশ, বাকি রয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বর। তবে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে তা আটকে যায়। এখন নতুন সরকারের অধীনে সংস্কারের হালনাগাদ রোডম্যাপ তৈরি করে আইএমএফকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আগামী জুন নাগাদ পরবর্তী অর্থ ছাড় হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


