অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এখন দেশের স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং এমনকি কৃষি খাতেও গুরুতর সংকট সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফারিদা আকতার।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রিভেন্টিভ প্র্যাকটিস, ওয়ান হেলথ সহযোগিতা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
উপদেষ্টা রোববার সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ–২০২৫ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত মাল্টি-সেক্টোরাল ওয়ান হেলথ এএমআর সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, দেশে সম্প্রতি ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক থাকলেও, এর চেয়েও বড় ও স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করছে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ব্যবহার।
তিনি বলেন, সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার ইতোমধ্যে ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ছাড়া পোল্ট্রি খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার ৭৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা সরাসরি মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি একবারে ঘটে শেষ হয়ে যায়; কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে, যোগ করেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ইনজেকশন দিলে ডাক্তার ভালো, অ্যান্টিবায়োটিক লিখলে ডাক্তার সেরা’—এ ধারণা প্রচলিত। এমনকি জ্বর না কমলেই বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দাবি করেন। এমনকি ১১ মাস বয়সী শিশুও রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের কথা ভাবলে হবে না। আমাদের অ্যানিমেল, ফরেস্ট ও ওয়াইল্ডলাইফ হেলথ—সবকিছুই সুরক্ষা দিতে হবে। খাদ্য, প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এ কারণেই ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রাণীতে যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে, ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ ছাড়া সমাধান নেই।
তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপদ না হলে মানুষের স্বাস্থ্য কখনোই নিরাপদ থাকবে না। এ জন্য জনসাধারণের মাঝে এমন দাবি জোরালো করতে হবে-‘অ্যান্টিবায়োটিক-ফ্রি মুরগি চাই, অ্যান্টিবায়োটিক-ফ্রি মাছ চাই’। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে সামাজিক চাপ ও সচেতনতা তৈরি করাই রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার অন্যতম কার্যকর উপায়।
তিনি বলেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়ে সচেতনতা শুধু একটি সপ্তাহে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বছরব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দিবসের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং যত তীব্র হচ্ছে, নতুন রোগের প্রকোপ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিও তত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স—দুটি বৈশ্বিক সংকট পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবু সুফিয়ান-এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন এফএও বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শিয়াওকুন শি, ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ, বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিরোফুমি কুগিতা (রেকর্ডেড), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাকিলা ফারুক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক খায়ের আহমেদ চৌধুরী।


