নরসিংদীর মনোহরদী ও গাজীপুরের কাপাসিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু নির্মাণের দাবি সাত বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। সম্ভাব্যতা যাচাই, মাটি পরীক্ষা ও সমীক্ষার পরও সেতু নির্মাণ শুরু না হওয়ায় প্রতিদিন বাঁশের সাঁকো ও নৌকায় নদ পার হচ্ছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রাম এবং গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের মির্জানগর গ্রামের মাঝ দিয়ে নদটি প্রবাহিত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও রোগীসহ সাধারণ মানুষ প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নদ পার হচ্ছেন। বর্ষায় এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য সময় মতো বাজারে নেওয়া যায় না। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। জরুরি রোগী পরিবহনেও দুই পাড়ের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
দৌলতপুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়, দৌলতপুর ইউনিয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাপাসিয়ার বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এ ছাড়া, কাপাসিয়ার আড়াল বাজারের এন.পি.এম অ্যাপারেলস লি. নামের তৈরি পোশাক কারখানায় দৌলতপুর ইউনিয়নের অনেক নারী শ্রমিক কাজ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নৌকা বা সাঁকো দিয়ে নদ পারাপারের সময় ডাকাতির ঝুঁকি ও নারীদের নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়।
সেতুটির গুরুত্ব বিবেচনায় কয়েক বছর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই ও মাটি পরীক্ষা করে। এরপর স্থানীয়দের সইযুক্ত একটি আবেদন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে জমা দেওয়া হয়। দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মো. আল-ফাহাদের উদ্যোগে আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এর অনুলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরেও পাঠানো হয়।
মো. আল-ফাহাদ জানান, ২০২২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও এলজিইডির একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষার পরও সেতু নির্মাণ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিদিন নৌকা ও বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে নদ পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসেন দৌলতপুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুর রশিদ মিয়া। তিনি বলেন, ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র শাখা নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ নদের ওপর সেতু নির্মিত হলে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।’
বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাফায়েত হোসেন শাকিব জানায়, বাঁশের সাঁকোটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এটি ব্যবহার করে স্কুলে যেতে পারে না শিশু শিক্ষার্থীরা। ফলে অনেকটা পথ ঘুরে স্কুলে যেতে হয়। এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে স্কুলে যাতায়াতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আরও নিশ্চিন্ত বোধ করবেন।
খেয়াঘাটের মাঝি মিলন মিয়া বলেন, ‘এখানে একটি সেতু খুব প্রয়োজন। সেতুটি হলে এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে এবং জনদুর্ভোগ অনেক কমে যাবে।’
মির্জানগরের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদির বলেন, ‘মাটি পরীক্ষা হলো, মাপজোখ হলো; কিন্তু সেতুর কাজ আর শুরু হলো না। আমাদের ভরসা এখনো সেই বাঁশের সাঁকো আর নৌকা।’
মির্জানগর নতুন বাজারের পল্লী চিকিৎসক জহিরুল ইসলাম (জুলহাস) বলেন, ‘দৌলতপুর রথখোলা বাজার ও মির্জানগর বাজারের মধ্যে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি। সেতুটি নির্মিত হলে দুই এলাকার মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক সুবিধা হবে।’
দৌলতপুর রথখোলা বাজারের ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন বলেন, ‘একটি সেতুর অভাবে ব্যবসায়ী, ক্রেতাসহ সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক প্রতিশ্রুতি মিললেও এখনো সেতুর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। আমরা দ্রুত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি।’
নরসিংদীর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশা বলেন, স্থানটিতে সমীক্ষার পর সেতু নির্মাণের জন্য নরসিংদী প্রকল্প-২-এর মাধ্যমে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এখনো প্রকল্পটি পাস হয়নি। প্রকল্প পাস হলে সেখানে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা হবে।


