অর্থ বিল পাস, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ

অর্থ বিল পাস, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ
ফাইল ফটো
Advertisement
Advertisement

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ ও মুদি দোকান ভ্যাটের আওতার বাইরে রেখে জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থ বিল পাস-২০২৬ হয়েছে। এতে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, জমি নিবন্ধনের বিতর্কিত বিধান বাদ, তিন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) বাধ্যবাধকতা করার প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্পে শুল্ক কমানোসহ বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

উপস্থিত সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। এর আগে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এ সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া অর্থ বিলে প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাখা হয়েছিল। সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী চার বছরে ধাপে ধাপে এ সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করার রূপরেখাও যুক্ত করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের পার্থক্য নিরসনে একটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছিল। তবে এটি কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, এমন সমালোচনার পর অর্থ বিল থেকে পুরো বিধানটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তির নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ছিল। সংশোধনীতে এই তিন ক্ষেত্র থেকেই বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর বহাল রাখা হয়েছিল। অর্থ বিলে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বাজেটে অনলাইন ভিডিওভিত্তিক সেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম ও হীরার অলংকারের ভ্যাট কাঠামো নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব অলংকার কেনার ক্ষেত্রে ৫০ পয়সা হারে উৎসে কর কাটার বিধান যুক্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

মাছ সরবরাহের যোগানদার পর্যায়ের ভ্যাট এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজস্ব ভাগের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। চিংড়ি শিল্প, ওষুধশিল্প, বৈদ্যুতিক তার, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, পরিশোধিত তামা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বাজেটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার রিটার্ন দাখিলের বিধান করা হয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির জন্য আলাদা সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনী প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করে কর আরোপের বিধান করা হয়েছে।

পাস হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিধানের বাইরে থাকবে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধন বা বার্ষিক বিক্রি রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংঘের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অর্থ বিল পাসের আগে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে ঋণের আশ্বাসের বাস্তবতার মতো নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। তবে সেই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

পরে সংসদ সদস্যদের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বাকিগুলো কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।

বিল পাসের প্রক্রিয়ায় বক্তৃতাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং হয়রানি বন্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র মুদি দোকান এই ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকবে। তিনি বলেন, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই রাজস্ব আদায়ে এই গতি এসেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad