অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করল জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। দলগুলোর পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জোটের চূড়ান্ত আসন বিন্যাস ঘোষণা করা হয়।
জামায়াত ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল মোহাম্মদ তাহের আসন বিন্যাসে ঘোষণা দেন। আসন সমঝোতায় ১১ দল থাকার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়নি।
ঘোষিত আসন বিন্যাসে জামায়াত ১৭৯ আসন, এনসিপি ৩০ আসন, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য ২০টি, আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি দুই, নেজামে ইসলাম পার্টি দুই ও এবি পার্টিকে তিনটি আসন দেওয়া হয়েছে। খেলাফত আন্দোলন ও জাগপাকে কোনো আসন দেওয়া হয়নি।
আসন বিন্যাসে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রশ্নের উত্তরে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। দলটি নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া আরও শক্ত করছে। আমরা আশা করছি, দলটি আমাদের সঙ্গে থাকবে।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চাঁদ, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমাদ আব্দুর কাদেরসহ জোটের শীর্ষ নেতারা।
এর আগে দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১০ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক থেকেও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়।
পরে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়, আসন সমঝোতা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিতে কাউকে বিভ্রান্তি না হওয়ার জন্য জানানো হয়।
বৈঠক শেষ জামায়েত ইসলামের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
তারা বলেন, রাতে সংবাদ সম্মেলনে জোটের আসন বিন্যাস নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা করা হবে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আসন সমঝোতায় চেষ্টা করে আসছিল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য ছয়টি দল। যার মধ্যে ছিল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
সবশেষ এ আটটি দলের সঙ্গে গত ২৮ ডিসেম্বর জোটে যুক্ত হয় আরও তিনটি দল। মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শেষ মুহূর্তে এসে এই তিনটি দল বিশেষ করে এনসিপি জোটে যুক্ত হওযায় নিজেদের কাঙ্ক্ষিত আসন না পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
গত কয়েকদিনে দলগুলোর দফায় দফায় বৈঠকে পর ১১ দলের মধ্যে ৯টি দলে আসন সমঝোতা নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে সংকট চলছিল। পাশাপাশি মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও সেটি সংকটের পর্যায়ে ছিল না।
জামায়াত শেষ পর্যন্ত ৪৫টি আসন ইসলামী আন্দোলনকে দিতে রাজি হয়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ চাওয়া ছিল ৬০টি আসন।
জানা গেছে, জামায়াতসহ আট দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে প্রায় তিন মাস যুগপৎ আন্দোলন ছিল। তারা এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে জোরালো ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী দলগুলোর ভোট যেন ‘একবাক্সে’পাঠানো যায় তা নিশ্চিতে দলগুলো আগে থেকেই জোর দিয়ে এসেছে।
আটটি দলের মধ্যে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা রয়েছে জামায়াত ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। দল দুটির আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করায় আগামী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে। তবে, শেষ সময়ে এনসিপিকে জোটে নেয়ার বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে জামায়াত ও সমমনাদের। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি যুক্ত হলে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার চেয়ে তরুণ্যে শক্তিকে কাজে লাগাতে চায় জামায়াত জোট। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে হাঁ এর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা।
এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের এলডিপিকে কাছে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ইস্যুতে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে দলগুলো।
গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ সময়ে দলগুলো আসন সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মনোনয়ন জমা দেয় এসব দলের প্রার্থীরা।
আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এসময়ের মধ্যে দলগুলোতে আসন সমঝোতা হলে আসন প্রতি একটি দলগুলোর একজন প্রার্থী থাকবেন। অন্যরা প্রত্যাহার করবেন।


