আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরে জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলায় এক ভয়াবহ ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড থেকে জানা গেছে, মামলার আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে প্রসিকিউশন টিমের সদস্য ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছেন।
এই ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, যা নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ফাঁস হওয়া দুটি অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ও আসামি পক্ষের আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফের মধ্যে এক কোটি টাকার বিনিময়ে আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। রিজওয়ানা ইউসুফ চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর ভাতিজি।
উল্লেখ্য, ফজলে করিম চৌধুরী বর্তমানে গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন এবং তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী জামিনে রয়েছেন। অডিও রেকর্ড অনুযায়ী, এই দুজনকে মামলা থেকে রেহাই দিতে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। এই অর্থ কয়েক কিস্তিতে পরিশোধের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্রমতে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা এই অডিওর প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এক মিনিট ৩৬ সেকেন্ড এবং তিন মিনিট ৪২ সেকেন্ডের দুটি কল রেকর্ডে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল নোমান, মইনুল করিম এবং তানভীর হাসান জোহার নামও উঠে আসে।
একটি রেকর্ডে সাইমুমকে বলতে শোনা যায়, বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর একজন ‘ভালো মানুষ’ এবং সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের নিয়ে একটি বৈঠকের পর বিষয়টি নিয়ে ‘ইতিবাচক’ সিদ্ধান্ত আসবেন। এ ছাড়া কথোপকথনে ‘চাচি’ সম্বোধন করে সাবেক এমপির স্ত্রীর সঙ্গে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে যোগাযোগের পরামর্শও দেওয়া হয়।
অডিও ফাঁসের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রসিকিউটর সাইমুম সোমবার পদত্যাগ করেন। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অডিও ফাঁসের কারণেই তিনি তড়িঘড়ি করে সরে দাঁড়িয়েছেন। যদিও সাইমুম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, রেকর্ডের কণ্ঠটি তার নয় এবং তিনি শিক্ষকতা পেশায় ফেরার জন্যই পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এই বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, তিনি অডিওগুলো শুনেছেন এবং সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের কাছে পাঠিয়েছেন।
জানা গেছে, তাজুল ইসলাম প্রসিকিউটরের এই অর্থ দাবির কথা আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে সহকর্মীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে থাকায় তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, তার হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাতেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, চট্টগ্রামের মীর মুনিরিয়া দরবার শরিফ থেকেও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। সেখানে তদন্ত কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল যেন ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলেকে রেখে বাকি অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরেই আসামিদের নাম সম্পূর্ণ বাদ দিতে এক কোটি টাকার নতুন দাবি সামনে আসে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বিষয়টির ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
প্রসিকিউশন টিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আরও ব্যাপক। প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ অপর প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিমের বিরুদ্ধেও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় এসআই আফজালুল হককে আসামি না করে সাক্ষী করা, চানখাঁরপুলে গুলিবর্ষণের নির্দেশদাতা এসআই আশরাফুল ইসলামকে আসামি না বানিয়ে সাক্ষী করা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় তাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার মতো ঘটনাগুলো নিয়ে প্রসিকিউশন টিমে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। এক পর্যায়ে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ ও তামিমের অফিসের ভেতরে এসআই আশরাফুলের সঙ্গে হাতাহাতির উপক্রমও হয়েছিল।
এ ছাড়া রামপুরা হত্যাকাণ্ডে সেনা কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করা হলেও মতিঝিল জোনের ডিসি হায়াতুল ইসলাম খানকে বাদ দেওয়া এবং সাবেক ডিবির এসি জাভেদ ইকবালের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে বিচারের আওতায় না আনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ‘ইমরান’ নামে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করবে এবং গণঅভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি অবিলম্বে এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।


