দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানি ও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে লিজ দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতায় শুরু হওয়া এ কর্মসূচির কারণে প্রতিদিনই অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
পাইলটিং সেবা বন্ধ থাকায় বহির্নোঙর থেকে কোনো জাহাজ জেটিতে ঢুকতে বা জেটি থেকে বের হতে পারছে না। ফলে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এনসিটি, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) অন্তত ১৪টি কনটেইনার ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।
বুধবার থেকে জেটিতে পণ্য ওঠানামা ও কনটেইনার ডেলিভারির সব কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যদিও বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের কাজ সীমিত আকারে চলছে, তবে জেটি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বন্দরের মূল অপারেশন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিভিন্ন বন্দর শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলনটি ৩১ জানুয়ারি আট ঘণ্টার কর্মবিরতির মাধ্যমে শুরু হয়। এরপর ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি একই কর্মসূচি পালিত হয়। মঙ্গলবার এটি ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে রূপ নেয় এবং বুধবার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন অভিযোগ করেন, আন্দোলন দুর্বল করতে বন্দরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ঢাকায় আটকে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার বা শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই।
বন্দর সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে এনসিটিতে পাঁচটি, জিসিবিতে সাতটি এবং সিসিটিতে দুটি জাহাজ অলস অবস্থায় পড়ে আছে, যেগুলোর আমদানি পণ্য এখনো জাহাজেই রয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব জাহাজ দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পণ্য খালাস শেষে সিঙ্গাপুর, কলম্বো, মালয়েশিয়া ও তানজুং পেলেপাসসহ বিভিন্ন গন্তব্যে রপ্তানি পণ্য নিয়ে যাত্রা করে। কর্মবিরতির কারণে সেই সূচি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
শিপিং অপারেটররা বলছেন, ক্ষতির অঙ্ক দ্রুত ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। কর্ণফুলী গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এইচ আর লাইনস লিমিটেডের পাঁচটি জাহাজের মধ্যে দুটি জেটিতে ও তিনটি বহির্নোঙরে আটকা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আনিস উদ দৌলা বলেন, শুধু অপারেটিং খরচ হিসাবেই প্রতিটি জাহাজে দৈনিক ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
শিপিং এজেন্টরা জানান, দেরির কারণে প্রতিটি জাহাজে দৈনিক ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত চার্জ যোগ হচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ওপর পড়বে এবং দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
এরই মধ্যে দেশের ভেতরে প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ২১টি বেসরকারি আইসিডি থেকে বন্দরে রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ। সংগঠনটির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি পণ্য ডিপোগুলোতে জমে যাচ্ছে। কারখানাগুলো পণ্য পাঠালেও তা বন্দরে নেওয়া যাচ্ছে না এবং প্রতি ঘণ্টায় জট বাড়ছে।
নির্ধারিত জাহাজ সূচিও ভেঙে পড়ছে। সিসিটি থেকে মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রার কথা থাকা কনটেইনার জাহাজ সোল প্রমিস কর্মবিরতির কারণে একটি কনটেইনারও খালাস করতে পারেনি। একই ধরনের বিলম্ব এখন একাধিক জাহাজে দেখা দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং সূচিতে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
সৌদি মালিকানাধীন রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল পরিচালিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালেও এর প্রভাব পড়েছে। সেখানে ইয়ার্ড ডেলিভারি স্বাভাবিক থাকলেও পাইলটিং সেবা বন্ধ থাকায় জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম শাখার কমার্শিয়াল ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্স প্রধান সায়েদ আরেফ সরোয়ার জানান, একটি নির্ধারিত কনটেইনার জাহাজ পাইলট না থাকায় জেটিতে আসতে ব্যর্থ হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও পরিচালক প্রশাসন মো. ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে প্রতিটি অলস দিনই অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বাড়াবে বলে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, এতে রপ্তানিকারকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, খরচ বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটে বাংলাদেশের অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


