সিরাজগঞ্জের উলিপুর গ্রাম এখন শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য

সিরাজগঞ্জের উলিপুর গ্রাম এখন শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য
শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পাখিদের কলকাকলি। দিঘির পাড়ের প্রাচীন বটগাছসহ বিভিন্ন গাছের ডালে ডালে শামুকখোল পাখির আনাগোনা। কোনোটি ছানাদের খাবার দিতে ব্যস্ত, আবার একটি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে খাবারের সন্ধানে। আরেকটি বাসার পাশে বসে আগলে রাখছে ছানাদের। রাত পোহালেই এই পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।

প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলসংলগ্ন উলিপুর গ্রামে। কয়েকশ বছরের পুরোনো প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের উলিপুর দিঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল। প্রায় এক যুগ ধরে এখানে বাসা বেঁধে আছে শামুকখোল পাখি। স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা ও সচেতনতায় পাখিগুলো পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। পাখির অবাধ বিচরণ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত উলিপুর গ্রামের এ দিঘির পাড়ের প্রাচীন বটগাছসহ বিভিন্ন গাছে শামুকখোল পাখির বাসা রয়েছে। এ ছাড়া পানকৌড়িসহ আরও কয়েক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এখানে।

সরেজমিন দেখা যায়, দিঘির পাড়ের গাছগুলোয় শামুকখোল পাখির ব্যস্ততা। কোনোটি গাছের ডালে বসে আছে, কোনোটি ছানাদের আগলে রাখছে, আবার কোনোটি এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে। গাছের নিচে দাঁড়ালে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একের পর এক পাখি। দিঘির শান্ত জল, সবুজ গাছপালা আর পাখির কলকাকলি মিলে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ।

গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রায় এক যুগ আগে শামুকখোল পাখিরা এখানে এসে গাছে গাছে বাসা বাঁধতে শুরু করে। এরপর থেকে প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। পাখিগুলো এখন এই গ্রামেই নিয়মিত বসবাস করছে। পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন স্থানীয়রা। কেউ যেন পাখিদের বিরক্ত বা ক্ষতি করতে না পারেন, সে বিষয়ে তারা সচেতন।

ছবি: টাইমস

 

স্থানীয় মুদি দোকানদার জাকারিয়া বলেন, শামুকখোল পাখি আসার পর থেকেই গ্রামবাসী তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কেউ যেন পাখিদের বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে সবাই সচেতন। বাইরে থেকে কেউ পাখি দেখতে এলে গ্রামবাসী নিজেরাই তাদের পাখিদের বিরক্ত না করার অনুরোধ জানান। মানুষের বসতির মধ্যেই পাখিগুলো নিরাপদে বসবাস করছে।

গ্রামের বাসিন্দা ফারুক বলেন, আগে তাদের আত্মীয়স্বজনই মূলত গ্রামে বেড়াতে আসতেন। এখন পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। এতে গ্রামটি নতুনভাবে পরিচিতি পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী শামুকখোল পাখির প্রধান খাবার। উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় থাকায় পাখিগুলো এখানেই থাকছে।

আরও পড়ুন

শিক্ষক তন্ময় পাখি দেখতে উলিপুরে এসেছিলেন। একসঙ্গে এত শামুকখোল আগে কখনো দেখেননি জানিয়ে তিনি বলেন, পাখিদের এমন অবাধ বিচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। গ্রামের বাসিন্দাদের চেষ্টায় পাখিগুলো এখানে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে।

ছবি: টাইমস

 

স্থানীয় চাকরিজীবী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘পাখির বিচরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সারাক্ষণ পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত চারপাশ। যা দেখে খুবই ভালো লাগল। আবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসব।’

স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী জীবন বলেন, উলিপুর দিঘির চারপাশের গাছপালা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। গাছপালা রক্ষা এবং পাখিদের নির্বিঘ্নে বিচরণের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এখানে আরও বেশি পাখির সমাগম ঘটতে পারে। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

উলিপুর দিঘিসহ একাধিক স্থানে পাখির অভয়ারণ্যের বিষয়টি প্রশাসনের জানা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান। পাখিদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলেও জানান তিনি।

ছবি: টাইমস

এদিকে চলনবিল ও বিভিন্ন দিঘিতে শীত মৌসুমে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে। স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের ধারণা, বর্তমানে চলনবিল ও দিঘিগুলোতে অতিথি পাখির সংখ্যা কয়েক লাখ হতে পারে। তবে এ সংখ্যার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব পাওয়া যায়নি। সকাল-বিকাল দর্শনার্থীরা এসব স্থানে গিয়ে পাখির কলকাকলি উপভোগ করছেন। কেউ কেউ ক্যামেরায় ধারণ করছেন পাখিদের ডানা মেলে উড়ে চলার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা কমে গেলে এবং খাবারের সংকট দেখা দিলে অনেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখি অনুকূল পরিবেশ ও খাদ্যের সন্ধানে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। বাংলাদেশে সাধারণত শরৎ ও শীত মৌসুমে এসব পাখির আগমন বাড়ে। দেশের হাওর, বিল, নদী ও জলাভূমিগুলো তখন পরিযায়ী পাখির বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে।

তবে পাখিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। শীতের প্রকোপ কমে গেলে পরিযায়ী পাখিরা আবার ফিরে যায় নিজেদের প্রজনন ও আবাসস্থলে। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে শিকারিদের ফাঁদে পড়ে অনেক পাখি প্রাণ হারায়।

যমুনা সেতু পশ্চিম ইকোপার্কের ফরেস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, শীতের প্রকোপ কমে গেলে অতিথি পাখিরা আবার ছুটে চলে নিজ জন্মভূমিতে। বাংলাদেশে অবকাশ যাপনের ইতি ঘটিয়ে আপন ভূমিতে যাওয়ার জন্য আবারও হাজার মাইল পাড়ি দেয় তারা।

ছবি: টাইমস

তিনি আরও বলেন, যে নিরাপত্তার জন্য এ দেশে অতিথি পাখি আসে, সে নিরাপত্তা তারা পায় না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কিছু অসাধু মানুষ বিভিন্ন সময় এসব পাখি শিকার করে। শিকারিদের ফাঁদে পড়ে প্রতিবছর অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এভাবে প্রতিবছর অতিথি পাখি নিধন হতে থাকলে প্রকৃতি হারাবে তার নিজস্ব রূপ, বিলুপ্তি ঘটবে বহু পাখি প্রজাতির। তাই সবার উচিত অতিথি পাখিদের নিরাপত্তাদানে মানবিক হওয়া।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পাখির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাখির অবাধ বিচরণ পরিবেশের সুস্থতারও একটি ইতিবাচক দিক। উলিপুর গ্রামের শামুকখোল পাখির এই আবাসস্থল শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে না, স্থানীয় পর্যায়ে পাখি সংরক্ষণেরও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানুষের সচেতনতা, গাছপালা সংরক্ষণ এবং প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকলে উলিপুর দিঘি ভবিষ্যতেও পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে থাকবে। পাখিদের নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতির এই অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে আগামী প্রজন্মও।

আরও পড়ুন: শৈলকুপায় পুকুরপাড়ে অতিথি পাখির অভয়ারণ্য

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad