রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার দুই আসামি।
পুলিশ জানিয়েছে, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২–এ দুই আসামির জবানবন্দি নেওয়া হয়। জবানবন্দি শেষে আদালতের নির্দেশে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে শনিবার ভোরে গণপটি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস (১৯) ও সিদ্ধার্থ দাস (২৩) নামের দুই তরুণকে আটক করে পুলিশ।
রোববার বিকালে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। পরে আটক দুই আসামিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাদের আদালতে নেওয়া হয়।
আদালতের বিচারক রফিকুল ইসলামের কাছে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ‘চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।’
তবে জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, ঘটনার বিস্তারিত বা অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকার বিষয়ে কী বলা হয়েছে, তা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করেননি তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আসামিরা অপরাধে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।’
এর আগে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের ঘটনা দেখে ফেলাকে কেন্দ্র করেই গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।
নিহতরা হলেন- গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘এই ঘটনায় নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই আমরা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেব।’
এর আগে পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তী জিলা স্কুলের হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি পরিবার নিয়ে নগরীর মাছুয়াপাড়া মন্দির এলাকার দোতলা বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চেম্বার পরিচালনা করতেন। ওই বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাশের বাড়ির ছাদ হয়ে অভিযুক্তরা বৃহস্পতিবার রাতে গণপতির বাড়ির ছাদে আসে ও ইয়াবা সেবন করে। এ সময় শব্দ পেয়ে ছাদে এসে তাদের অবস্থানের জানতে চাইলে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অভিযুক্তরা গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তার চিৎকারে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে এলে তাকেও একইভাবে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
একসময় মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী চিলেকোঠায় এগিয়ে এলে তাকেও ছাদে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে শিশু প্রিয়মকে ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তারা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করেন এবং ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর খান ও ইয়াবা সেবন করেন। ওই রাতে তারা গণপতির বাড়িতেই ছিলেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকায় সেই সুযোগে তারা পরিবারটির স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। মূলত তাদের পরিচয় গোপন রাখতে এবং ঘটনাটিকে ডাকাতির দিকে প্রবাহিত করতেই তারা আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। গয়নাগুলো কাছের একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গা থেকে জব্দ করা হয়েছে বলেও জানায় পুলিশ।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা রানী বলেন, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে প্রথমে তিনি বোনকে ফোন করেন ও ফোন বন্ধ পান। পরে ভাগ্নি, দুলাভাই ও ছোট ভাগ্নেকে ফোন করেও সবার ফোন বন্ধ পান। এতে তার সন্দেহ হয়। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান।
বাইরে থেকে কারও সাড়া না পাওয়ায় স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাচীর টপকে তারা ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বাইরে থেকে জানালা খুলে ভেতরের সবকিছু এলোমেলো দেখতে পান। একই সঙ্গে ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।


