জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বহুল আলোচিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তবে বিল দুটি নিয়ে পৃথক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হলেও সেখানে অংশ নেননি বিরোধী দলের সদস্যরা। তারা বিল দুটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই অংশ নেবেন না বলে কমিটিকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
রোববার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, এমরান আহমদ চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা, মো. মনজুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও আলফারুক আব্দুল লতীফ অংশ নেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটির বৈঠকে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬’ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে বিল দুটি সংসদে পাসের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বিরোধী দলের তিন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আলফারুক আব্দুল লতীফ ও আখতার হোসেন বৈঠকে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আলোচনার আগে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। তারা সংসদীয় কমিটিতে কমিটির কাছে লিখিতভাবে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
লিখিত বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ভুক্তভোগী, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতামত উপেক্ষা করে সরকার একতরফাভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ রহিত করেছে। অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক জোটের স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপালস এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ বিষয়ে কমিটির বিরোধী দলের সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিলটির ওপর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ মতবিনিময় এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে। এতে স্থায়ী কমিটিকে ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনায় অংশ না নেওয়া এবং বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের কথা লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কমিটির সংশ্লিষ্ট বৈঠক বর্জনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের মত দমন করার জন্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওই পাশে যারা আছেন, তারা আপনাদের তিন গুণ। আপনারা যদি শব্দ করেন, তারাও শব্দ করবেন। এ ধরনের বক্তব্য সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের কথা বলার অধিকার ও মর্যাদাকে আঘাত করছে।
তিনি বলেন, সেদিন সংসদ থেকে আমরা ওয়াকআউট করেছিলাম, সেটিও ছিল সংসদীয় ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদ। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত বিল নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির রিপোর্টেও আমাদের বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নিচ্ছে না।
এদিকে রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বিলটি পাসের সুপারিশ করা হয়।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, শিরীন সুলতানা, মো. নূরুল ইসলাম এবং মো. আব্দুল বাতেন অংশগ্রহণ করেন। তবে বৈঠক থেকে কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্য মো. নূরুল ইসলাম ও মো. আব্দুল বাতেন ওয়াকআউট করেন। দলীয় অবস্থানের কারণে আলোচিত ওই বিলের আলোচনায় অংশ নেননি বলে তারা জানান।


