‘মক্কা চুক্তিতে রয়েছে বাংলাদেশের সুযোগ, আছে ঝুঁকিও’

‘মক্কা চুক্তিতে রয়েছে বাংলাদেশের সুযোগ, আছে ঝুঁকিও’
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ, যৌথ প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক, ইসরায়েল ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

তাই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে এর শর্ত, সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজের সহযোগিতায় ভয়েস ফর রিফর্ম এ আয়োজন করে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থান বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় মক্কা প্যাক্টের মতো প্রতিরক্ষামূলক জোট সহায়ক হতে পারে। এতে প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থা, সামরিক সক্ষমতা, যৌথ প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতসহ সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বঙ্গোপসাগর, মিয়ানমার ও আশপাশের অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

তার মতে, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর সমষ্টিগত নিরাপত্তা দিতে না পারায় নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে শাহাব এনাম খান বলেন, পূর্ণ সদস্যপদ না হলে পর্যবেক্ষক হিসেবেও যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির বলেন, মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হলে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে। সৌদি আরবের সহযোগিতার পাশাপাশি তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি থেকেও বাংলাদেশ সুবিধা নিতে পারে।

হাসান নাসির বলেন, মক্কা প্যাক্ট যেন ‘ওআইসি-২.০’তে পরিণত না হয়। অতিরিক্ত সদস্য যুক্ত হলে জোটটির কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

তবে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, চুক্তির শর্ত এবং সম্ভাব্য খরচ-সুবিধা সম্পর্কে জনগণ ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না।

মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলেই বাংলাদেশের সব নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান হবে এমন ধারণা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে চুক্তিটিকে ‘শর্টকাট সমাধান’ হিসেবে দেখানোর আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, মক্কা প্যাক্টকে কোনোভাবেই ভারতবিরোধী জোট হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত, নদীসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রয়েছে। তাই জোটে যোগ দেওয়ার কারণে কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হওয়া কাম্য নয়।

সভাপতির বক্তব্যে আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কমিটির প্রধান দিলারা চৌধুরী বলেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নয়, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে নিতে হবে।

তিনি বলেন, চুক্তির বিস্তারিত শর্ত, ভবিষ্যৎ সদস্যদের অবস্থান এবং এর কৌশলগত প্রভাব স্পষ্ট হওয়ার আগে বাংলাদেশকে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। শিয়া-সুন্নি বিভাজন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, ইসরায়েল ইস্যু এবং ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

দিলারা চৌধুরী বলেন, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ এখনো আসেনি। তাই আগে আমন্ত্রণ ও চুক্তির বিস্তারিত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এরপর জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ বলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও জনশক্তি খাতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তবে সরাসরি সদস্য হওয়ার পাশাপাশি পর্যবেক্ষক বা সহযোগী সদস্য হওয়ার বিকল্পও বিবেচনা করা উচিত।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, নদী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। মক্কা প্যাক্টের সুবিধা নিতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশকে অযথা বিরক্ত না করার কৌশলও ঠিক করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ ড্যানিলোউইজ বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আপত্তি নেই। তবে এর সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার ওপর চুক্তিটির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর