নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ভাঙেনি ডেডলক। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও মেলেনি গোলের দেখা। দুই গোলরক্ষকের অতিমানবীয় সব সেভ আর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের রোমাঞ্চ ছড়ানো ১২০ মিনিটের ম্যারাথন লড়াই শেষে স্কোরলাইন ০-০।
অবশেষে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ আটের অন্তিম টিকিটের ফয়সালা হলো টাইব্রেকার ভাগ্যে। আর সেখানে কলম্বিয়াকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করল সুইজারল্যান্ড।
এই জাদুকরী জয়ে ১৯৫৪ বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ ৭২ বছর পর ফের বিশ্বমঞ্চের শেষ আটে পা রাখল সুইসরা, যেখানে সেমিফাইনালের ওঠার লড়াইয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হবে মিসরকে হারিয়ে আসা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভার স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকে ছড়ি ঘুরিয়েছে দুই দলের আক্রমণভাগ। তবে ম্যাচের আসল নায়ক হয়ে রইলেন দুই গোলকিপার। বিশেষ করে দারুণ কিছু সেভ দিয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন সুইস প্রাচীর গ্রেগর কোবেল।
ম্যাচের ২১ মিনিটেই প্রথম নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করে কলম্বিয়া। বক্সের সামনে ডান দিকের ওপরের কোণা থেকে বাঁকানো শটে গুস্তাভো পুয়ের্তা প্রায় গোল পেয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাজপাখির মতো লাফিয়ে বল বাইরে ঠেলে দেন কোবেল। পরে হামেস রদ্রিগেসের বিপজ্জনক কর্নারও চমৎকারভাবে ক্লিয়ার করেন এই সুইস গোলরক্ষক।
প্রথমার্ধের পানি পানের বিরতির পর চেনা ছন্দে ফেরে সুইজারল্যান্ড। ৩১ মিনিটে উইঙ্গার ফ্যাবিয়ান রাইডার সুবিধাজনক স্থানে বল পেয়ে ডি-বক্সের বাম দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। কলম্বিয়ার গোলকিপার কামিলো ভারগাসের সঙ্গে ওয়ান-অন-ওয়ান অবস্থায় রাইডার জোরালো শট নিলেও ভারগাস তা অবিশ্বাস্য দক্ষতায় প্রতিহত করেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও লড়াইয়ের তেজ কমেনি। ৫১ মিনিটে ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে রাইডারকে ফাউল করেন সানচেজ। ফাউল থেকে উঠে দাঁড়িয়েই রাইডার যে শটটি নেন, তা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সাইড-নেটে কাঁপন ধরায়। কলম্বিয়াও পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি।
৬৩ মিনিটে কাছের পোস্ট ফাঁকা পেয়েও শট লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজ। তবে নির্ধারিত সময়ের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি নষ্ট হয় যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে)। ম্যানুয়েল আকানজির নিখুঁত থ্রু বল ডি-বক্সের ভেতরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন ড্যান এনডয়ে, কিন্তু তার দ্রুতগতির শটটি গোলপোস্টের কোণ ঘেঁষে বাইরে চলে গেলে আক্ষেপে পোড়ে সুইজারল্যান্ড।
ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে সুইসদের ওপর আক্রমণের স্টিমরোলার চালায় কলম্বিয়া। ১০১ মিনিটে কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড ক্যাম্পাজ ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে কাছের পোস্ট লক্ষ্য করে একটি নিচু শট নেন। গোলটি যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, তখনই কোবেল প্রায় ভলিবলের মতো করে ঘুষি মেরে বল বাইরে পাঠিয়ে সুইজারল্যান্ডকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
১২০ মিনিটের খেলা শেষে পেনাল্টি শুটআউটে প্রথম শটেই কলম্বিয়ার কুইন্তেরো এবং সুইজারল্যান্ডের জাকা সফলভাবে জাল কাঁপান। তবে দ্বিতীয় শটে কলম্বিয়া শিবিরে নেমে আসে অন্ধকার, ডেভিনসন সানচেজের নেওয়া শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে গোললাইন অতিক্রম করতে পারেনি। অন্যদিকে, সুইস তারকা আমদোনি কলম্বিয়ান গোলকিপারকে ভুল দিকে পাঠিয়ে সুইজারল্যান্ডকে এগিয়ে নেন।
তৃতীয় শটে ক্যাম্পাজ কলম্বিয়ার হয়ে গোল করার পর সুইজারল্যান্ড নিজেদের শটটি মিস করলে ম্যাচে ফের সমতা ও উত্তেজনা ফিরে আসে। তবে চতুর্থ শটে কলম্বিয়াকে রুখে দিয়ে সুইশদের জয়ের নায়ক বনে যান গোলকিপার কোবেল।
এরপর সুইশরা নিজেদের শটে গোল করে পঞ্চম শটের আগেই ৩-২ ব্যবধানে লিড নেয়। শেষ শটে লুইস দিয়াজ কলম্বিয়াকে সমতায় রাখলেও শেষ রক্ষা হয়নি। নিজেদের শেষ শটে লক্ষ্যভেদ করে ৪-৩ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে সুইজারল্যান্ড।
আগামী রোববার, বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় এই লড়াকু সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লাতিন ছন্দ রুখে দেওয়া সুইসরা এবার মেসি-ব্রিগেডকে কতটা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


