জাল নথিতে বাল্যবিয়ে, কাঠগড়ায় আইনজীবী

জাল নথিতে বাল্যবিয়ে, কাঠগড়ায় আইনজীবী
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আইন ভেঙে ১১ বছরের এক শিশুর বয়স ১৮ বছর দেখিয়ে বিয়ের অ্যাফিডেভিট (হলফনামা) করার অভিযোগ উঠেছে।

ফেসবুকে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর তা আদালতের নজরে আসে। বর্তমানে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস কোলের ছয় মাসের সন্তানসহ ওই শিশু-মাকে তার মায়ের জিম্মায় পাঠিয়েছে। তবে বেআইনিভাবে এই বাল্যবিয়ে দেওয়ার অপরাধে এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযুক্ত আইনজীবী তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল জানিয়েছে, এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তারা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

আদালতের দেওয়া নথিতে দেখা যায়, মেয়েটির বর্তমান বয়স ১৩ বছর, কিন্তু বিয়ের খাতায় তা লেখা হয়েছে ২০ বছর। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আজিমুল হক চৌধুরীর তৈরি করা এক অ্যাফিডেভিটে শিশুটির বয়সের সঙ্গে অতিরিক্ত সাত বছর যোগ করা হয়েছিল।

আদালতের কাগজপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল মো. শাকিল মিয়া নামের এক যুবক ওই শিশুটিকে বাড়ি থেকে লুকিয়ে নিয়ে যান। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়।

বিয়ের আগেই আইনজীবী আজিমুল একটি অ্যাফিডেভিট তৈরি করে দাবি করেন, মেয়েটির বয়স ১৮ বছর। এরপর দুই লাখ টাকা দেনমোহরে তথাকথিত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ সম্পন্ন করা হয়।

বিয়ের কাবিননামায় শাকিলের জন্মতারিখ ১৭ জুলাই ২০০৪ দেখিয়ে বয়স লেখা হয় ২১ বছর। আর শিশুটির জন্মতারিখ ৫ মার্চ ২০০৬ দেখিয়ে বয়স উল্লেখ করা হয়।

তবে জালিয়াতির কথা অস্বীকার করে আইনজীবী আজিমুল হক চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিয়ের রেজিস্ট্রি কাজীর মাধ্যমে হয়েছে। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করার কোনো আইনি ভিত্তি বাংলাদেশে নেই।

মেয়েটির বয়স বাড়িয়ে অ্যাফিডেভিট বানানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

আরও পড়ুন

যদিও নোটারি করা সেই নথিতে তার স্বাক্ষর ও চেম্বারের ঠিকানা স্পষ্ট রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘বার কাউন্সিলে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করা হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে, অভিযুক্ত যুবক শাকিল দাবি করেন, বিয়ের সময় তাকে যে কাগজপত্র দেখানো হয়েছিল, তাতে মেয়েটির বয়স ১৮ বছরই ছিল। আদালতে আসার পরই তিনি জানতে পেরেছেন মেয়েটির বয়স আসলে ১৩ বছর।

শিশুটির মা জানান, তার মেয়ে তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় শুরু থেকেই তিনি এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন।

আইন অনুযায়ী মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। ২০১৯ সালে আইন মন্ত্রণালয় নোটারি এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক দেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে।

গত ১ জুলাই শিশুটির পরিবার অভিযোগ তোলে, ছয় মাসের দুধের শিশুকে কেড়ে নিয়ে মেয়েটিকে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ পেয়ে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অভিযুক্তদের তলব করে।

ছেলের বাড়ির লোকজন হাজির না হওয়ায় বাচ্চাটিকে উদ্ধার করার জন্য চকবাজার থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

মেয়ের পক্ষের আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, শুটিং স্পট দেখানোর লোভ দেখিয়ে শিশুটিকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাকে এক জায়গায় আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

তিনি আরও জানান, একটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে মেয়েটির সই নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বিয়ের কাগজ হিসেবে সাজানো হয়।

শিশুটির বাবা জানান, শাকিল যখন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন মেয়ে বড় হলে ভেবে দেখবেন। কিন্তু শাকিল পরিবারকে না জানিয়ে মেয়েটিকে কয়েকবার তুলে নিয়ে যায় এবং কোথায় বিয়ে করেছে তাও জানায়নি।

আদালতে শাকিল দাবি করেন, ফেসবুকে পরিচয় হওয়ার পর মেয়েটিই তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং না নিলে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়েছিল। সেই ভয় থেকেই তিনি তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন।

গত মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান ১৩ বছরের মেয়েটি ও তার ছয় মাসের সন্তানকে মায়ের জিম্মায় হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

সায়েম খান বলেন, মেয়েটি নিজেই তো একটা ছোট শিশু, এই বয়সে তার একটি সন্তান আছে—এটা বিশ্বাস করাই কঠিন।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু বাচ্চাটিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে, তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে আপাতত সে মায়ের কাছেই থাকবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর