কেরোসিনের আলোয় ফুটে ওঠে স্বপ্ন

কেরোসিনের আলোয় ফুটে ওঠে স্বপ্ন
খাঁচায় কেরসিনের আলোয় ফোটানো হাঁসের বাচ্চা। ছবি: আল নাসিম তালুকদার/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ইনকিউবেটর ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ডিম ফোটানোর কাজ এখন অনেকটাই যন্ত্রনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামবাংলার চিত্র এখনও পুরোপুরি বদলে যায়নি। দেশের নানা প্রান্তে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দেশীয় কৌশলেই হাঁসের ডিম ফোটাচ্ছেন কৃষকেরা। সেই পুরোনো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর হাতেকলমে শেখা দক্ষতাই আজও তাদের জীবিকার অন্যতম ভরসা।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় এমনই এক ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির দেখা মেলে। এখানে প্রায় ২০০ বা তারও বেশি হাঁসের খামারের মালিক এখনো ডিম ফোটাতে স্থানীয়ভাবে ‘কেরোসিন পদ্ধতি’ নামে পরিচিত একটি কৌশল ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে কেরোসিনের বাতির স্থির তাপ কাজে লাগানো হয়। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কৃষকেরা এই তাপের ওঠানামা ও ব্যবস্থাপনা রপ্ত করেছেন।

কেরোসিনের বাতির তাপে ফোটানোর জন্য রাখা ডিম। ছবি: আল নাসিম তালুকদার/ টাইমস

প্রক্রিয়াটি শুরু হয় নির্দিষ্ট সংখ্যক হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় সংরক্ষণের মাধ্যমে। এরপর কাঠ, খড়, কাপড় কিংবা স্থানীয়ভাবে পাওয়া অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে কৃষকেরা এমন একটি আবদ্ধ ব্যবস্থা তৈরি করেন, যেখানে কেরোসিনের বাতির তাপে চারপাশের বাতাস উষ্ণ হয়, কিন্তু ডিমগুলো সরাসরি তাপের সংস্পর্শে আসে না।

ডিমগুলো বাতি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সাজিয়ে রাখা হয়। কতটা দূরে রাখতে হবে, কতটা তাপ প্রয়োজন, কখন তাপ কমাতে হবে কিংবা কখন বাড়াতে হবে—এসবের জন্য নেই কোনো আধুনিক মিটার বা স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কৃষকের হাত, চোখ এবং বছরের পর বছর সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই এখানে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি।

বাচ্চা ফুটে বেরিয়েছে। ছবি: আল নাসিম তালুকদার/ টাইমস

তাপমাত্রার পাশাপাশি আর্দ্রতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখার দিকেও কৃষকদের বিশেষ নজর দিতে হয়। সফলভাবে ডিম ফোটানোর জন্য তাপমাত্রার মতোই আর্দ্রতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের মতে, এই ভারসাম্য ঠিক রাখাই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ। সামান্য ভুলও কখনো কখনো নষ্ট করে দিতে পারে পুরো ব্যাচের ডিম।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটরের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে, অনেক সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

তাড়াইলের অনেক কৃষকের কাছে তাই কেরোসিন পদ্ধতিই হয়ে উঠেছে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য একটি বিকল্প। যা নির্ভরতার একটি সহজ ও পরীক্ষিত উপায়  এবং অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল নয়।

ছবি: আল নাসিম তালুকদার/ টাইমস

এই বাস্তবতায় তাড়াইলের অনেক খামারির কাছে কেরোসিন পদ্ধতি শুধু পুরোনো কোনো কৌশল নয়; বরং  বিদ্যুৎ না থাকলেও একটি কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে তারা চালিয়ে যেতে পারেন তাদের কাজ।

আধুনিক যন্ত্রের ঝলমলে আলো হয়তো গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো কৌশলকে ধীরে ধীরে আড়াল করে দিচ্ছে। তবু তাড়াইলের এই কেরোসিন পদ্ধতি মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি মানেই কেবল যন্ত্র নয়। মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষমতা এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে সমাধান খুঁজে নেওয়ার দক্ষতাও এক ধরনের প্রযুক্তি।

ছবি: আল নাসিম তালুকদার/ টাইমস

কেরোসিনের ছোট্ট শিখাটি তাই শুধু তাপ জোগায় না; তার আলোয় টিকে থাকে একটি ঐতিহ্য, একটি জীবিকা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা গ্রামীণ জ্ঞান। এটি শুধু হাঁসের ডিম ফোটানোর একটি কৌশল নয়; বরং গ্রামীণ বাংলার উদ্ভাবনী শক্তি ও দেশীয় জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।

জাতীয় গ্রিডের আলো যখন হঠাৎ নিভে যায়, তখনও তাড়াইলের কোনো এক গ্রামীণ ঘরে জ্বলতে থাকে সেই ক্ষীণ কেরোসিনের শিখা। তার উষ্ণতায় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে নতুন প্রাণ—আর সেই সঙ্গে বেঁচে থাকে বাংলার মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের অসাধারণ বুদ্ধি, ধৈর্য ও টিকে থাকার গল্প।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর