কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যাকাণ্ড: সিএনজিচালক সুমন গ্রেপ্তার

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যাকাণ্ড: সিএনজিচালক সুমন গ্রেপ্তার
হত্যাকাণ্ডের শিকার তাজমিন ও আসামি সুমন। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লার লালমাইয়ে ফসলি জমি থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তার মুঠোফোন কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার সুমনের টিকটক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওর আচরণ নিয়ে আলোচনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সুমন এর আগে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকার আবদুল আলীমের মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসায় থাকত সে। নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। চার দিন পর ফসলি জমিতে মেলে তার মরদেহ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শৃঙ্খলাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা ব্যাপক তদন্ত চলছে।

মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার রাতে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই রাতে লালমাই থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম। মামলায় কতজনকে আসামি করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।

তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলের পাশ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়ায় তদন্তে নতুন সূত্র পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর থেকেই অটোরিকশাচালক শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করে থানাপুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল। জেলার বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি জেলার বাইরেও অভিযান চালানো হয়। হত্যাকাণ্ডের আগের ও পরের বিভিন্ন তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। পরে তাকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরও পড়ুন

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে তাজমিন কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, তার সঙ্গে কারা ছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। তার বিরুদ্ধে আগে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের অংশ হতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তাজমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য প্রায় উন্মোচন হয়েছে। তদন্তের বাকি কাজ শেষ করে শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।

মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার নিয়ে শঙ্কা

মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাজমিনের মা। তিনি দাবি করেন, মেয়ের বান্ধবীদের কারণে তাকে হারাতে হয়েছে। হত্যাকারীদের বিচার চাইলেও সুষ্ঠু বিচার পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের মরদেহ পান। নিজের মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি দেশের সব মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

পদুয়ার বাজারে ছিনতাই চক্র নিয়ে উদ্বেগ

তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তের মধ্যে নতুন করে আলোচনা এসেছে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার ছিনতাই পরিস্থিতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে এ এলাকায় ছিনতাই বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। রাত গভীর হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঘুরে বেড়ায় ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা। নির্জন সড়কে একা যাত্রী পেলেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

এর আগে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় আইরিশ হিল হোটেলের পাশের ফুটপাত থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।

র‍্যাবের ( বর্তমানে এসআরবি) ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে বাস থেকে নামার পর পেশাদার ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের ফাঁদে পড়েন বুলেট বৈরাগী। যাত্রী ও চালকের ছদ্মবেশে থাকা চক্রের সদস্যরা তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে ব্যাগ, মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে চলন্ত অটোরিকশা থেকে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তার মৃত্যু হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দাবি, দুটি ঘটনার মধ্যে অপরাধের কিছুটা যোগসূত্র রয়েছে। তবে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ছিনতাই চক্রের সম্পৃক্ততা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে অপরাধের অভিযোগ এবং রাতের সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad