এক কলেজছাত্র প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বিশ্রী ভাষায় গালমন্দ করল, আর অমনি আমাদের রাষ্ট্র এক অদ্ভুত সত্য খুঁজে পেল: দেশের নিরাপত্তার নাকি নতুন এক শত্রু তৈরি হয়েছে–কথার ভাষা!
ক্ষেপণাস্ত্র খুঁজতে রাডার লাগে, বোমা খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা তথ্য লাগে, আর সশস্ত্র বাহিনীকে দমাতে লাগে নজরদারি। কিন্তু ফেসবুকে লেখা একটা খারাপ বাক্য? সেটির জন্য নাকি পুরো দেশজুড়ে মহাপ্রস্তুতি দরকার! নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব বিভাগ অমনি জেগে উঠে ঘোষণা দিল: যাক, অবশেষে এমন এক শত্রু পাওয়া গেল যাকে আমরা অন্তত বুঝতে পারি!
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র সিফাত আবদুল্লাহ চার-পাঁচ হাজার টাকার দুটি বিদ্যুৎ বিল দেখিয়ে ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিল। দেশের পণ্যের দাম বাড়া আর সাধারণ মানুষের কষ্ট নিয়ে সে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।
এরপরই আসে আসল বিস্ফোরক বিষয়–সে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে গালাগাল করে বসে।
ফলাফল পাওয়া গেল এক মুহূর্তেই। আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড যেখানে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হিমশিম খায়, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ল সেই ছেলের কথাগুলো। চোখের পলকে ফেসবুকে ঝাড়া ক্ষোভ জাতীয় নিরাপত্তার এক বড় নাটকে রূপ নিল।
যে দেশ টানা বিদ্যুৎ দিতে পারে না, তারা যেন শক্তির নতুন এক উৎস খুঁজে পেয়েছে: তা হলো রাগ ও ক্ষোভ!
কথাটি আসলেই অবিশ্বাস্য। বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকার হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকে, কিন্তু একটা গালি পুরো সরকার ও প্রশাসনকে কয়েক মিনিটের মধ্যে নাড়িয়ে দিতে পারে।
কী দারুণ সাফল্য! পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যখন হুমকি চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, আমরা তখন আরও সস্তা এক প্রযুক্তি বানিয়ে ফেলেছি: অনুভূতির বুদ্ধিমত্তা!
রাষ্ট্র শুধু জিজ্ঞেস করে, ‘কাকে অপমান করা হয়েছে?’ আর অমনি অ্যালার্ম বেজে উঠে ঠিক করে ফেলে–বিষয়টি কি নিছক একটা কৌতুক, কোনো সমালোচনা, নাকি দেশের বড় কোনো বিপদ!
প্রধানমন্ত্রীকে গালি দেওয়া কোনো মানুষ আর নিছক একজন রাগি, হতাশ বা অবুঝ ব্যক্তি থাকেন না। তাকে অভিনন্দন–তিনি নতুন এক ক্যাটাগরিতে ঢুকে গেছেন: যা একাধারে ইন্টারনেট অপরাধী এবং দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি!
এরই মধ্যে ঘটেছে আরেকটি অলৌকিক ঘটনা।
অন্য একটি দল আবার আবিষ্কার করে ফেলেছে যে, গালি যদি সঠিক রাজনৈতিক শত্রুর দিকে ছোঁড়া হয়, তবে সেটা আর গালি থাকে না!
তাদের কাছে এই ছাত্রটি কোনো অপরাধী নয়; সে একজন ডিজিটাল যোদ্ধা। হাতে স্মার্টফোন থাকা এক মুক্তিযোদ্ধা! যার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু আছে অনুভূতিতে আঘাত করার মতো ধারালো সব শব্দ।
গণতন্ত্রের এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গণতন্ত্র মানে আর কোনো যুক্তি, জবাবদিহিতা বা আলোচনার বিষয় নয়।


