জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) চলমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১১তম জাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ।
শুক্রবার রাতে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফাইয়াজ আহমেদ অর্ক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দীর্ঘ ৩৩ বছরের অপেক্ষা ও সংগ্রামের পর গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাকসুর দশম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন দশকের বেশি সময় পর নির্বাচন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসততা ও কূটচালের কারণে তা পূরণ হয়নি। সংগঠনটির অভিযোগ, শুরু থেকেই নির্বাচন ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষপাত ও নিরপেক্ষতার অভাব ছিল। নির্বাচনের তারিখ নিয়ে টালবাহানা, ভোটার তালিকা তৈরিতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং নির্বাচন আয়োজনের নামে আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।
ছাত্র ইউনিয়নের দাবি, প্রশাসন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে অবৈধভাবে সুবিধা দিয়েছে এবং একাধিকবার নিজেদেরই নির্বাচনী নীতিমালা ভঙ্গ করেছে। একই সঙ্গে প্রশাসন সামগ্রিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করে, শিক্ষার্থী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অংশের হাতে কর্তৃত্ব চলে যাক—এমন পরিস্থিতি প্রশাসন চায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের অসহযোগিতার মুখে জাকসু নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টা করা হলেও পরে শিক্ষার্থীদের জোর দাবির মুখে নির্বাচন আয়োজন করা হয়। তবে নির্বাচন এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে ফলাফল প্রশাসনের অনুকূলে যায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত জাকসু নির্বাচন ছিল অংশগ্রহণের দিক থেকে অসম এবং অনিয়মে পরিপূর্ণ। অনেক প্রার্থীকে প্রশাসন অবৈধ সুবিধা দিয়েছে, আবার অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। ভোটের দিন নির্বাচনে অংশ নেওয়া পাঁচটি প্যানেলের মধ্যে একটি প্যানেল নির্বাচন বর্জন করে। একই সঙ্গে টিউটোরিয়াল নির্বাচন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অনিয়ম ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।
সংগঠনটির অভিযোগ, নির্বাচনকালীন প্রশাসনের গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দায়িত্বে থাকা একজন শিক্ষক প্রাণ হারান। এসব দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এড়িয়ে গেছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি সংগঠনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘শিবিরবিরোধী’ জোটের প্যানেল জয় লাভ করে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন, ঘৃণা ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ক্যাম্পাসে নারীবিদ্বেষ, হেনস্তা, ধর্মবিদ্বেষ ও মৌলবাদের বিস্তার ঘটছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
ছাত্র ইউনিয়ন বলছে, শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করা এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি অংশ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল এবং প্রশাসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীদের হয়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে প্রশাসনের ‘এজেন্ট’ বা তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত এক বছরে জাকসুর প্রধান কর্তব্যের পরিবর্তে নানা আপাতদৃষ্টিনন্দন আয়োজন করা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীলতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে পশ্চাৎপদতা ও মৌলবাদের বীজ বপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন দাবি করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের আয়োজিত নির্বাচন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ জাকসু নির্বাচন প্রয়োজন। সংগঠনটির মতে, ২০২৫ সালের মতো প্রহসনের নির্বাচন তারা চায় না; এমন একটি নির্বাচন প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থীরা সুস্থ পরিবেশে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন।
এ অবস্থায় ১১তম জাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ দ্রুত ঘোষণা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কমিটি গঠন, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী ব্যালটসহ সার্বিক প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন।
সংগঠনটি আরও বলেছে, জাকসু গঠন ও পরিচালনা সংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ করে নিয়মিত নির্বাচনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।


