যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে এখন কে না জানে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডগুলো ভরে আছে এ সংক্রান্ত তথ্যের বাহুল্যতায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর লিড স্টোরিও এখন এই সংঘাতের খবর।
কিন্তু আমি লিখতে বসেছি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, যে গত আট বছরের বেশি সময় ধরে কাতারে বাস করছে; তার অনুভূতির কথা। যদিও অনুভূতিগুলো এখন আর ঠিক ধারাবাহিকভাবে লিখতে পারব না। মিসাইলের আতঙ্কে আমাদের সব স্বাভাবিকতায় ভাটা পড়েছে।
এখন দিনে বেশ কয়েকবার বেজে ওঠে সাইরেন, যা আমাদের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে সতর্ক করে।
যে মুহূর্তে কাতারের এয়ার ডিফেন্স কাতারের আকাশ সীমানায় মিসাইলের আগমনের সংকেত পায়, সঙ্গে সঙ্গে সাইরেন বাজিয়ে মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠায়। যাতে সবাই দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারে।
অবশ্য এই নিরাপদ আশ্রয়ের সংজ্ঞা কী, আমি জানি না। কোনো জায়গাই তো নিরাপদ না; না সেটা মিসাইলের আঘাত থেকে, না মিসাইল ইন্টারসেপশনের ফলে ভূপাতিত হওয়া শার্পনেল বা ডেবরিস থেকে। পার্থক্য শুধু এটুকুই, মিসাইল ভূপাতিত হলে জনপদ ধ্বংস হবে, অনেক প্রাণ যাবে। আর কাতার যদি মিসাইল প্রতিরোধ করে বা ইন্টারসেপ্ট করে তাহলে তার ধ্বংসাবশেষ পড়লেও ক্ষয়ক্ষতি হয়ত অল্প হবে।
কিন্তু সেই অল্প ক্ষয়ক্ষতিও তো কোনো না কোনো মানুষেরই হবে। হয় কারও প্রাণ যাবে নয়ত ঘরবাড়ি পুড়ে ছারখার হবে।
এই তো দুদিন আগেই আমার প্রতিবেশির গাড়ির ওপর শার্পনেল পড়ল আর পাশাপাশি দুটো গাড়ি মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
তাহলে কে নিরাপদ? কোনটা নিরাপদ জায়গা? জীবনে এমনও দিন যে দেখতে হবে, সেটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি।
দিনে কতবার যে সাইরেন বাজে! আর এই সাইরেনের শব্দই হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তখন মুহূর্তের জন্য হাত-পা অবশ হয়ে আসে। দেশে থাকা প্রিয়জনদের চেহারা চোখে ভেসে ওঠে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহে তো ঘুমাতেই পারিনি। ঠিকমতো ইফতার করতে পারিনি, এমনকি আমার ওয়াশরুমে যেতেও ভয় লাগত। মনে হতো, আমি ওয়াশরুমে গেলেই সে মুহূর্তে মিসাইল পড়বে, কিংবা পড়বে ধ্বংসাবশেষ।
অনেকেই হয়ত জানেন না, উন্মুক্ত আকাশে যখন এক দেশ আরেক দেশের মিসাইল প্রতিহত বা ইন্টারসেপ্ট করে তখন সেখানে থাকা ঘরবাড়ি, দরজা-জানালা ৪-৫ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে থাকে।

আমরা এখন এতটাই ট্রমাটাইজড হয়ে গেছি যে, ঘরের ভেতরে বা বাইরে ছোটখাটো কোনো স্বাভাবিক শব্দেও হার্টবিট বেড়ে যায়। মনে হয়, এই বুঝি মিসাইল পড়ল।
সত্যি বলতে কী, যে চোখ ইন্টারসেপশনের স্ফুলিঙ্গ দেখেছে, সেই চোখে ঘুম আসা মুশকিল।
প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় নিয়ে একটা গোটা রমজান মাস পার করে দিলাম। শুক্রবার আমাদের ঈদ।
কাতার তার নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে যে, এবার কোনো খোলা জায়গায় বা ঈদগাহে নামাজ হবে না। বরং নামাজের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হবে ১৫ মিনিটের মধ্যে। কিন্তু আমাদের অন্তর জানে, এই বার্তা যতটা না নিরাপত্তার আশ্বাস দেয় তার চেয়ে বেশি মৃত্যুভয় জোগায়।
গত কয়েকদিন ঈদের প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে আমরা প্রস্তুত থেকেছি জরুরি নির্গমণের ঘোষণার জন্য।
ঘুমহীন চোখে, ক্লান্ত মনে এই লেখা লিখছি। মনে হচ্ছে, আঙুল যেন চলছেই না। এমনকি যখন লিখছি, তখনও মাথার ওপর যুদ্ধবিমান উড়ছে, শুনতে পাচ্ছি তার গগনবিদারী শব্দ। জানি না, কবে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব।
সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, এই পৃথিবীতে যেন আর কোনো গাজা তৈরি না হয়।


