ঘড়ির কাঁটায় তখন ম্যাচের বাকি মাত্র ২৩ মিনিট। ডাগআউটের স্কোরবোর্ডটা চোখ রাঙাচ্ছে আর্জেন্টিনা ০, মিশর ২। বিশ্বমঞ্চে এমন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে কোনো কোচের মনের ভেতর কেমন সুনামি বয়ে যেতে পারে, তা ফুটবলপ্রেমীদের অজানা নয়। কিন্তু ডাগআউটে লিওনেল স্কালোনি মানেই তো এক শান্ত, অবিচল হিমশৈল। শত চাপের মুখেও যিনি মুখে আঙুল দিয়ে ছক কষেন ঠান্ডা মাথায়।
তার সেই অবিনশ্বর বিশ্বাসের ওপর ভর করেই আর্জেন্টিনা রূপকথা লিখে জিতেছে ৩-২ ব্যবধানে। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন বুক থেকে চড়ে বসা পাহাড়সম চাপটা নেমে গেল, তখন আর নিজের ভেতরের আবেগটাকে আটকে রাখতে পারলেন না এই কচ্ছপ-গতির মাস্টারমাইন্ড।
ম্যাচ পরবর্তী লাইভ সাক্ষাৎকারে এসে কান্না চেপে রাখতে না পেরে মাঝপথেই ক্যামেরা ছেড়ে চলে গেলেন আলবিসেলেস্তেদের প্রধান সেনাপতি।
মিশর বধের মহাকাব্যিক থ্রিলারের পর সম্প্রচার চ্যানেলের মুখোমুখি হয়েছিলেন স্কালোনি। কিন্তু মাইক্রোফোন হাতে আসতেই দেখা গেল এক অন্য স্কালোনিকে। গলার স্বর বুজে আসছিল, চোখের কোণে চিকচিক করছিল জল, যা সরাসরি দেখছিল টিভির কোটি কোটি দর্শক।
ম্যাচের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে যান স্কালোনি। এরপর কান্নাসিক্ত কণ্ঠে ধিমে লয়ে বলেন,আমি ‘খেলোয়াড়… ব্যস এটুকুই। আমাকে এখন যেতে হবে।’
এই কটি শব্দ উচ্চারণ করেই মিক্সড জোন ও ইন্টারভিউয়ের ইতি টেনে চোখের জল লুকাতে দ্রুত প্রস্থান করেন স্কালোনি। অথচ এই স্কালোনিকে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকার জয়ের পরও এতটা আবেগপ্রবণ হতে দেখেনি কেউ। সেদিন বিশ্বজয়ের মহাকেন্দ্রে দাঁড়িয়েও যিনি এক চিলতে হাসির বাইরে আবেগের লেশমাত্র দেখাননি, আজ আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের বিপক্ষে শেষ ১৬-এর ম্যাচেই তার বাঁধভাঙা অশ্রু দেখে অবাক ফুটবল বিশ্বও।
আসলে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে তার শিষ্যরা মাত্র ১৩ মিনিটে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিল, সেই অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতাই হয়তো এই কোচের ভেতরের সমস্ত কাঠিন্যকে গলিয়ে জল করে দিয়েছে। নিজের একঝাঁক যোদ্ধার প্রতি অপরিসীম গর্ব আর স্বস্তির এই অশ্রুই যেন বলে দিচ্ছে–২০২৬-এর বিশ্বমঞ্চে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে এই দলটির আত্মিক শক্তি কতটা গভীর।


