সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটির মতে, এই খসড়া আইনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত কমিশন কোনোভাবেই একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে না, বরং তা সরকারের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের নিকট ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করেছে টিআইবি ও একইসঙ্গে আইনটি চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়া আইনটিতে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী ও প্যারিস নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না। তবে নতুন খসড়া আইনের ধারা ৩(২) থেকে এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক কমিশনকে করায়ত্ত করার এবং এর স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তা ছাড়া, খসড়া আইনের ধারা-৭ অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
টিআইবি খসড়া আইনের ধারা-১৩ তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থলগুলোতে নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
একইসঙ্গে, ধারা-১৬ তে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সংকুচিত করে খসড়া আইনের ধারা-২০ এ ২০০৯ সালের বিতর্কিত বিধানটি হুবহু প্রতিস্থাপন করায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি এবং ধারাটি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে।
এই দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন কখনো ‘এ’ স্ট্যাটাস পায়নি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করে।
অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে কমিশন গঠনে কমপক্ষে একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং কমপক্ষে দুজন নারী কমিশনার রাখার সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা। পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারীদের স্বীয় পদে চাকরিরত অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হওয়ার বিধান বাতিল এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে দলনিরপেক্ষতা ও সততার শর্ত যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
কমিশনের প্রশাসনিক স্বাধীনতা রক্ষায় প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রেষণে নিয়োগের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ করা এবং ধারা-৩৬(১) সংশোধন করে কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে টিআইবি, যাতে অনুমোদিত বাজেটের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে না হয়।
টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন ও কার্যকরভাবে ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে এর পরিণতি সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে। তাই জনস্বার্থে খসড়া আইনটি সংশোধন ও চূড়ান্তকরণে সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা জরুরি বলেও মনে করে টিআইবি।


