মানবতার সঙ্গে ট্রাম্পের ‘তামাশা’

মানবতার সঙ্গে ট্রাম্পের ‘তামাশা’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প | ফাইল ছবি: এএফপি/বাসস
Advertisement
Advertisement

এই কথাগুলো কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা দায়িত্বহীন কোনো যোদ্ধার কাছ থেকে আসেনি, বরং এগুলো এসেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে; যিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রধান। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একগুচ্ছ পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে এক নজিরবিহীন হুমকি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মঙ্গলবার হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতু ধ্বংসের দিন… ওই ফ***ইন (গালি) হরমুজ প্রণালি খুলে দাও… না হলে তোমরা নরকের মধ্যে বাস করবে।’

এরপর তিনি বিষয়টিকে আরও উসকে দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি চাই না এমনটা হোক, কিন্তু সম্ভবত এটা হতে যাচ্ছে।’

এমন ভাষার ভয়াবহতা বর্ণনা করা কঠিন। এটি কোনো কৌশলগত অস্পষ্টতা বা সাবধানের হুঁশিয়ারি ছিল না। এটি ছিল সরাসরি একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রকাশ্য পরিকল্পনা, যা একজন প্রেসিডেন্টের সংযত আচরণের দীর্ঘদিনের নিয়মকে চুরমার করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্টের পদের সঙ্গে সবসময় একটি অলিখিত দায়বদ্ধতা থাকে–অগাধ ক্ষমতার সঙ্গে কথায় ও কাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এ ক্ষেত্রে সেই শৃঙ্খলার লেশমাত্র ছিল না।

ইরানের নেতারা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন কোনো হুমকি দিতেন, তবে তাকে নিশ্চিতভাবে চরম উসকানি বা সরাসরি সন্ত্রাসবাদ হিসেবে গণ্য করা হতো। অথচ ওয়াশিংটন যখন এমন কথা বলে, তখন তাকে প্রায়ই ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। এই বৈষম্য আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি সম্পর্কে এক গভীর অস্বস্তি তৈরি করে–যে নিয়মগুলো শক্তিশালী দেশগুলোর ক্ষেত্রে নমনীয় হয়ে যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই ভাষা প্রেসিডেন্টের মেজাজ সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার কথাগুলো গোছানো বা কোনো সুচিন্তিত কৌশলের অংশ ছিল না। এগুলো ছিল অস্থির, খামখেয়ালি এবং গণহত্যা নিয়ে উদ্বেগজনকভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ।

সমালোচকদের মতে, এটি তাদের সেই পুরোনো ভয়কে সত্য প্রমাণ করেছে-বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামরিক বাহিনী এমন একজন নেতার হাতে পরিচালিত হচ্ছে যার বিচারবুদ্ধি যেকোনো সময় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়তে পারে, যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

যে প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্যগুলো দেওয়া হয়েছে তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এরই মধ্যে ইরানের ওপর এমন এক সামরিক হামলা চালিয়েছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক আত্মরক্ষা নয় বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন হিসেবে দেখছেন। ইরান এমন কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল যার জন্য এই ধরনের হামলা প্রয়োজন–তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যখন কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল এবং উত্তেজনা কমানোর পথ খোলা ছিল, তখন হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর পরিণতি হয়েছে মারাত্মক। বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং হাজারো মানুষ মারা গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে এমন সাধারণ মানুষও ছিলেন, যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা সামরিক বাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি যুদ্ধের এলাকার বাইরেও এর প্রভাব পড়েছে–যেমন ছয়জন বাংলাদেশি প্রবাসীর নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এই মৃত্যু এবং ধ্বংস অনিবার্য ছিল না, বরং অনেকের মতে এটি এড়ানো সম্ভব ছিল।

আরও পড়ুন

এই সংঘাত রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা বেছে বেছে হত্যার বিষয়টিকে স্বাভাবিক করে তুলছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর হামলাকে হয়তো কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু এটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করছে। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা যখন নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন, তখন যুদ্ধের সীমানা এমনভাবে বদলে যায় যা পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এই কার্যক্রমে সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে। যদি এটি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তবে যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যাবে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উদ্বেগের কথা জানানো হলেও কার্যকর হস্তক্ষেপ ছিল খুবই সীমিত। অনেকের কাছে এটি এক ধরনের নীরব সমর্থন, বিশেষ করে বৈশ্বিক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকার কারণে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরায়েলের যৌথ অপারেশন এই ধারণাকে জোরালো করেছে, তারা কোনো জবাবদিহি ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে হামলা করে যাচ্ছে।

পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি আবারও গভীর বৈষম্যকে সামনে এনেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে হামলার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ ইসরায়েল–যাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়–তারা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির তোয়াক্কা করে না এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে থাকে। এই বৈষম্য পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এত উত্তেজনার মাঝেও শেষ মুহূর্তে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী হামলার ডেডলাইনের কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং আলোচনার সুযোগ দিতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এই চুক্তির শর্ত ছিল ইরানকে লড়াই থামাতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। এটি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে এবং তেলের দাম কমে যায়।

তবে, এই যুদ্ধবিরতির একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। প্রকাশ্যে ধ্বংসের হুমকি দিয়ে প্রেসিডেন্ট এক কঠিন সংকটে পড়েছিলেন–হয় হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়া, না হয় পিছিয়ে এসে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো। এই সাময়িক বিরতি তাকে সেই সংকট থেকে উত্তরণের পথ করে দিয়েছে। এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং কেবল সময়ের সুযোগ নেওয়া।

ট্রাম্প প্রশাসন একে সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও আমেরিকার ভেতরে এটি সবাই মেনে নেয়নি। একজন জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান সিনেটর সতর্ক করেছেন, এমন উত্তেজনা বাড়ানো হবে একটি ‘বিরাট ভুল’। অন্য আইনপ্রণেতারা একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংসের হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘এমন কথা দেশটির মূল্যবোধের পরিপন্থী।’

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো হয়নি। স্থায়ী শান্তির জন্য ইরানের দেওয়া শর্তগুলো (নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার) বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই যুদ্ধবিরতি কোনো স্থায়ী শান্তি নয়, বরং সংঘাতের মাঝে একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।

যদি কোনো স্থায়ী চুক্তি হয়ে থাকে, তবুও এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যাবে। ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বনেতাদের কথা বলার মানদণ্ডকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে এবং এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা কূটনীতিকে কঠিন করে তুলবে। এখন থেকে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে তার অস্থির মেজাজের কথা মাথায় রাখতে হবে এবং শত্রুরা এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের এক স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দাবি করে এসেছে। কিন্তু সেই ভাবমূর্তি এখন সংকটে। তার বদলে এখন এমন এক পরাশক্তির রূপ ফুটে উঠেছে যারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কথা ও অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।

মূল প্রশ্নটি এখন কোনো নীতি বা কৌশল নিয়ে নয়, বিচারবুদ্ধি নিয়ে। যখন সীমাহীন সামরিক ক্ষমতার অধিকারী এক নেতা হুটহাট একটি সভ্যতা ধ্বংসের কথা বলেন, তখন তা বিশ্ব নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

আপাতত সংকট হয়তো কমেছে। হামলা থেমেছে, হুমকি কমেছে এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই কথাগুলোর রেশ রয়ে গেছে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এত বড় কথা সহজে মুছে যায় না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad