
‘ঈদের পর ২৬-২৭ জুনের (২০২৪ সাল) মধ্যে আমরা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। সেই সময় থেকেই সবার সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক আলোচনার শুরু। অনলাইনে আন্দোলনকে আলোচনায় আনার পাশাপাশি অফলাইনে আমাদের বিভিন্ন পরিচিতজন ও গ্রুপের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করি। এ পর্যায়ে আমরা দাবিগুলো আরেকটু গুছিয়ে আনি। আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল করার দাবিতে। ১ জুলাই থেকে আমরা দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু করি। এ পর্যায়ে আন্দোলন থেকে চার দফা দাবি পেশ করা হয়। এর আগে আদিবাসীদের কোটা, নারীদের কোটা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান পর্যন্ত কোটা রাখার বিষয়গুলো আলোচনা হয়,’— স্মৃতিচারণায় বলছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শীর্ষক গ্রন্থে অভ্যুত্থানের দিনলিপি তুলে ধরেছেন সজিব ভূঁইয়া। গত মার্চে প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত বইটিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত’ পর্বে তিনি জানিয়েছেন রক্তস্নাত সেই উত্তাল দিনগুলোর অনেক অজানা কথা।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘১ জুলাইয়ের আগে লাইব্রেরির সামনে কয়েক দফায় উন্মুক্ত আলোচনা করে সবার মতামতের ভিত্তিতে দাবিগুলো নির্ধারণ করা হয়। ২৯ জুন লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে উন্মুক্ত আলোচনার জন্য আহ্বান করা হলে সবাই লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়। পরে হ্যান্ডমাইকে সেখানে আলোচনা হয়। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মতামত দেয়। এর মধ্য দিয়ে সবার ঐকমত্যের মাধ্যমে চার দফা তৈরি হয়। হলগুলোতেও আমরা এ ধরনের আলোচনা করার চেষ্টা করি।’
‘১ জুলাইয়ের কর্মসূচিটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। সবাইকে যুক্ত করা দরকার ছিল, যাতে আন্দোলনে সবাই একাত্মতা অনুভব করে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে কোটা সংস্কারের বিষয়টাকে অনেক জটিল করে দেখানো হচ্ছিল। তবে আমরা জানতাম, নির্বাহী আদেশেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কোটার প্রতিফলনও যাতে থাকে, সেটাই আমাদের ভাবনায় ছিল। আদিবাসী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা আবশ্যক’, বলে চলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের মূল দাবি ছিল ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র বহাল রেখে কমিশন গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব শ্রেণির সরকারি চাকরিতে অনধিক ১০ শতাংশ কোটা রেখে কোটার পুনর্বণ্টন বা সংস্কার।’…
দাবি-দাওয়া ব্যাখ্যা করে আসিফ মাহমুদ ব্যাখ্যা বলেন, ‘সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটাসুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না, যেকোনো চাকরিতে একবারই ব্যবহার করা যাবে। কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে। তখন পর্যন্ত কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে পদ খালি রাখা হচ্ছিল। এ কারণে অনেকেই সুযোগ পাচ্ছিলেন না।’
‘এ ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছিল। সে সময়টাতে দেশব্যাপী আমলাদের দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা চলছিল। আমাদের ব্যাপারে অভিযোগ করা হচ্ছিল যে ছাত্ররা শুধু তাদের স্বার্থের বিষয়ে কথা বলে, জাতীয় বিষয় নিয়ে তাদের মনোযোগ নেই। অনেক দুর্নীতির ঘটনা তখন গণমাধ্যম নানাভাবে সামনে এনেছিল। সে কারণে এই দাবিটাকে আমরা অন্তর্ভুক্ত করি, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে সংযোগ অনুভব করে এবং ছাত্রদের দাবি যে শুধু নিজেদের চাকরি নয়, সেই বার্তাটা দেওয়া যায়।’
প্রথম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলনের সূচনা সম্পর্কে তিনি বলেন,
‘৪ দফা দাবিতে ১ জুলাই থেকে আন্দোলন আবার শুরু হয়। এবার আন্দোলন শুরু হয় “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ব্যানারে। এর আগপর্যন্ত আন্দোলন চলছিল “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ” ব্যানারে।’
‘জুলাইয়ের আগে আলোচনার মধ্যে আন্দোলনকে একটা নির্দিষ্ট ব্যানারে নিয়ে আসার কথা ভাবা হচ্ছিল। তখনো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন চলছে। আমরা ভাবলাম, এককাট্টা শক্তির প্রদর্শন করতে হলে একটা অভিন্ন ব্যানার প্রয়োজন। ২৯-৩০ জুন রাতে মল চত্বরে আমরা আন্দোলনের সংগঠক ও আগ্রহীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করি। সেখানে ব্যানারের জন্য বিভিন্ন নাম প্রস্তাব করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ব্যানারের নামটাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক না রেখে কী করে এমন একটা নাম দেওয়া, যাতে দেশব্যাপী সবাই ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় কোটা সংস্কারসংক্রান্ত অনেক নাম আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোতেও কয়েকটা নাম নিয়ে ভোট হয়। সেখানেও অনেকে অনেক নাম প্রস্তাব করছিল। কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম একটা সর্বজনগ্রাহ্য নাম রাখতে।’
‘এর আগে ২৭ বা ২৮ জুন সম্ভবত আবদুল হান্নান মাসউদ আমাকে বলেছিল, নামের মধ্যে “বৈষম্যবিরোধী” শব্দটা রাখা যায়। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে এই একটা সাধারণ চর্চা ছিল, কোনো একটা ব্যানার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষেত্রে সেটিকেই কাজে লাগানো। একই ভাবনা আমাদের মাথায়ও ছিল। আলোচনা চলতে থাকে। ৩০ জুন রাতে মল চত্বরে যে বৈঠক হয়, সেখানে সবার মতৈক্যের ভিত্তিতে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামটা চূড়ান্ত হয়, যদিও ফেসবুকে জরিপে অন্য একটা নামে বেশি সমর্থন এসেছিল। প্রায় ১১টা বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটা কলেজের সঙ্গে তখনো আমাদের যোগাযোগ ছিল। তাদের আমরা “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ব্যানারে কর্মসূচি করার নির্দেশনা দিই। তখন পর্যন্ত ফেসবুক গ্রুপের নামের পরিবর্তন হয়নি। কারণ, এরই মধ্যে “কোটা পুনর্বহাল চলবে না” নামটাও ব্র্যান্ডিং হয়ে গিয়েছিল।’

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘ঈদের ছুটির পর আন্দোলনে কেমন সাড়া পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে শঙ্কা ছিল। কিন্তু ১ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে ভালো সাড়া পাওয়া গেল। ২ জুলাই আমরা হলগুলোতে আরও মনোযোগ দিই। চার দফার পক্ষে হল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসার জন্য কর্মসূচি শুরুর এক ঘণ্টা আগে প্রতিটি হলে গিয়ে আহ্বান করা হয়। প্রতিটি হলের জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন টিম করে দিয়েছিলাম। এর আগে আদালতসহ নানা বিষয় সামনে আসায় অনেকের মধ্যে একটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু চার দফা দাবি সুনির্দিষ্ট হওয়ার পর সর্বত্র জনমত সৃষ্টিতে আমরা বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলাম।’
‘৪ জুলাই কোটা নিয়ে হাইকোর্টে একটা শুনানি হওয়ার কথা ছিল। শুনানিতে যাতে আমাদের দাবির প্রতিফলন ঘটে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছিলাম। সে জন্য আমরা ক্যাম্পাস থেকে একটা বড় মিছিল নিয়ে নিউমার্কেট ও কাটাবন ঘুরে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ সড়ক অবরোধ করি। সেদিন মিছিলের সারি অনেক লম্বা ছিল। এক-দেড় ঘন্টা মিছিলের পর সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই শাহবাগে কিছুক্ষণ অবরোধ করে রাস্তা ছেড়ে দিই। তখনকার অবস্থা বিবেচনায় শাহবাগ অবরোধ একটা বড় ব্যাপার ছিল।’
‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল ৩ জুলাই একটা বড় অবরোধ করা এবং ৪ জুলাই শুনানি চলাকালে মাঠে শক্ত অবস্থান রাখা। কিন্তু এ ঘোষণা আমরা আগেভাগে দিইনি। তাহলে আমাদের হয়তো শাহবাগে যেতেই দেওয়া হতো না। তার আগে আমাদের ২ জুলাইয়ের সফল কর্মসূচিতে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজসহ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়। সেদিন আমরা একটা বড় মিছিল করতে পারি।’…
‘৩ জুলাই আবার আমরা শাহবাগ অবরোধ করি। এই কর্মসূচি শুরুর আগেই খবর পেয়েছিলাম, বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের আসতে ছাত্রলীগ বাধা দিচ্ছে। সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য আমরা সেগুলোকে সেভাবে বলাটাকে এড়িয়ে চলি। সেদিন তিন-চার ঘণ্টা আমরা শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করি। বারবার পুলিশ এসে আমাদের উঠিয়ে দেওয়ার জন্য সমঝোতার চেষ্টা করছিল। বারবারই তারা বলছিল, এখন উঠে না গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কাঁদানে গ্যাস, টিয়ার শেল ছোড়া হবে ইত্যাদি।’
তিনি বলে চলেন, ‘আমাদের কর্মসূচিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। আন্দোলনে সফলতার একটা বড় কারণ মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তবু আমরা অবস্থান কর্মসূচিতে অনড় থাকি। পরদিন হাইকোর্টের রায়কে প্রভাবিত করার জন্য আমরা বার্তা দিতে চেয়েছিলাম, যাতে রায়টা শিক্ষার্থীদের পক্ষে আসে।’
‘৪ জুলাই হাইকোর্টে শুনানি হওয়ার কথা। তাই আমরা সেদিন শিক্ষা অধিকার চত্বর অবরোধের বিষয়ে আলোচনা করি। আন্দোলনের মধ্যে কেউ যদি আদালতের দিকে একটা ঢিল ছুড়ে বা ফটক ভেঙে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে-এমন আশঙ্কা থেকে শিক্ষা অধিকার চত্বর অবরোধের সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে আসি। মিছিল হাইকোর্ট এলাকার সড়ক দিয়ে ঘুরে শাহবাগে আসে। ৪ জুলাই পাঁচ-ছয় ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ করা হয়।’
‘ধীরে ধীরে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে’…যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।


