ছাত্র রাজনীতি ও বামপন্থী রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি এবং প্রথম সারির রাজনীতি–দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যাত্রা ছয় দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাওয়া ফখরুল নিজের দলের গণ্ডি পেরিয়েও সর্বজনগ্রাহ্য একজন উদার ও মার্জিত রাজনীতিবিদ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে বিকল্প কোনো ফলাফলের সম্ভাবনা কম থাকায় তার বঙ্গভবনে যাওয়া এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিষয়।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফখরুলের হাতে দলের মনোনয়ন ফরম তুলে দেন।
বৃহস্পতিবার বিকালে সচিবালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেন তারেক। বৈঠক শেষে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই সিদ্ধান্ত জানান।
পরে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মনোনয়ন পাওয়ার পর ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

নির্বাচন তফসিল অনুযায়ী, ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট, যা ১৯৯১ সালের পর ভোটাভুটির মাধ্যমে হতে যাওয়া প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকট এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলসহ কঠিন সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সহায়তা করার জন্য বিএনপির নেতারা তাকেই কৃতিত্ব দেন।
ওই সময়ে দীর্ঘদিন কারাগারে কাটানোর পর অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের পর তৎকালীন যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। ফখরুল দুই নেতার মধ্যে দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয় করেন এবং সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফখরুলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী অলি আহমেদ। তবে সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারবেন না।
গত ২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপি প্রার্থী হিসেবে ফখরুলকে চূড়ান্ত করার আগে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছিল।
নির্বাচন কমিশন ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই করবে এবং প্রার্থীরা ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতে পারবেন। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে ৩৫ বছরের মধ্যে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের ভোটাধিকার থাকবে এবং উন্মুক্ত ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে, যার অর্থ হলো দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যরা তাদের সংসদ সদস্যপদ হারাতে পারেন।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি এবং তৃণমূল পর্যায়ে দল সংগঠনের মাধ্যমে এগোতে এগোতে ফখরুল পরবর্তীতে বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া ফখরুল মুসলিম লীগ নেতা ও পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মির্জা রুহুল আমিনের ছেলে। তার বাবা পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের সরকারের আমলে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে তার শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কোর জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসার জন্য সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ন্যাপের (ভাসানী) মাধ্যমে তার জাতীয় রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে তিনি ধাপে ধাপে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন।
তার নির্বাচনী ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন তিনি বিএনপির মনোনয়নে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারের আমলে তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও ভোট কারচুপির অভিযোগে বিএনপি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করায় তিনি শপথ নেননি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ফখরুল আবারও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।


