চিকিৎসা খাত ও রোবোটিক্স প্রযুক্তির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল হিউম্যানয়েড রোবট। বিশ্বে প্রথমবারের মতো চিকিৎসকদের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে মানুষের অবয়বের এই রোবট।
গবেষকদের দাবি, এই সাফল্য যুদ্ধক্ষেত্র, প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা মহাকাশের মতো দুর্গম স্থানেও ভবিষ্যতের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান ডিয়েগো’-এর (ইউসি স্যান ডিয়েগো) সার্জনদের সঙ্গে মিলে একটি হিউম্যানয়েড রোবট সফলভাবে পিত্তথলি অপসারণের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে আরেকটি পরীক্ষামূলক অপারেশনে দুটি হিউম্যানয়েড রোবট পাশাপাশি একসঙ্গে কাজ করে ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে আরও একটি পিত্তথলি অপসারণ করে। এই পরীক্ষামূলক গবেষণার উভয় অপারেশনই স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর চালানো হয়েছে।
এই গবেষণাপত্রের অন্যতম প্রধান লেখক এবং ইউসি স্যান ডিয়েগোর ‘ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল ইপ বলেন, ‘এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, চিকিৎসাক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটের এক উজ্জ্বল ও কার্যকর ভবিষ্যৎ রয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত বা স্বয়ংক্রিয় হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর এমন সব জরুরি ও জটিল সার্জারির সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা রোগীরা হয়তো অন্য কোনোভাবে পেতেন না। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে চলমান স্বাস্থ্যসেবা সংকট মোকাবিলাতেও দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
গবেষকদের মতে, বর্তমানে চিকিৎসাক্ষেত্রে যেসব বিশেষায়িত ও ব্যয়বহুল রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর তুলনায় হিউম্যানয়েড রোবট বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা দেয়। সাধারণত হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে খরচ অনেক কম, এগুলো আকারে ছোট হওয়ায় অপারেশন থিয়েটারে জায়গাও কম নেয় এবং বিভিন্ন ধরনের জটিল ও নানামুখী কাজ করার ক্ষেত্রে এগুলো অত্যন্ত পারদর্শী।
গবেষণাপত্রের আরেক প্রধান লেখক এবং ‘ইউসি স্যান ডিয়েগো স্কুল অব মেডিসিন’-এর সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাংলেই লিউ অস্ত্রোপচারের সময় দূর থেকে রোবটটি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তি প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় খরচের সামান্য একটি অংশ মাত্র। ফলে গ্রামীণ এলাকা থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র ও মহাকাশের মতো যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে এটিকে সহজে মোতায়েন করা সম্ভব।’
‘সার্জি’ ডাকনামের এই রোবটগুলোকে বর্তমানে অভিজ্ঞ সার্জনরা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করলেও গবেষকরা আশাবাদী যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন এদের পরবর্তীতে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্ত্রোপচার করার সক্ষমতা এনে দেবে।
অধ্যাপক মাইকেল ইপ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেন, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় “সার্জিকাল অ্যাসিস্ট্যান্ট” বা অস্ত্রোপচারের সহকারী তৈরি করা। বিশ্বের অনেক অঞ্চলের হাসপাতালগুলোই পর্যাপ্ত সার্জিকাল কর্মীর সংকটে ভুগছে, যার কারণে রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পান না। আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ অপারেশন থিয়েটার কল্পনা করছি, যেখানে হিউম্যানয়েড রোবট ও মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি সমন্বিত দল হিসেবে কাজ করবে।’
‘ইন ভিভো ফিজিবিলিটি স্টাডি অফ হিউম্যানয়েড রোবটস ইন সার্জারি’ শিরোনামের এই যুগান্তকারী গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ গত বুধবার বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।


