প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা সাধারণত অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের মানসিক প্রভাব নিয়েই বেশি চিন্তা করি। কিন্তু স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র আমাদের শরীরেও নীরবে নানা পরিবর্তন ঘটাচ্ছে—যার অনেকটা আমরা বুঝতেই পারি না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অভ্যাসে ঘাড়ের আকৃতি বদলে যেতে পারে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, হাতের শক্তি কমে যেতে পারে, সূক্ষ্ম নড়াচড়ার দক্ষতা দুর্বল হতে পারে, এমনকি ত্বকেও নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সময়মতো কিছু অভ্যাস বদলালে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিবিসি সাংবাদিক থমাস জারমেইন লক্ষ্য করেন, তার কনিষ্ঠ আঙুলে শক্ত চামড়ার মতো একটি ছোট উঁচু অংশ তৈরি হয়েছে। ঠিক যেখানটায় তিনি প্রতিদিন ফোন ভর দিয়ে ধরেন। এরপরই তিনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, স্মার্টফোন শরীরের অন্য অংশে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র ঘাড়ের গঠন পরিবর্তন করতে পারে, দৃষ্টিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, হাতের পেশিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে এবং শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেকের আশঙ্কা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন ত্বকে বলিরেখা তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। এসব শারীরিক সমস্যা পরবর্তীতে স্মৃতিশক্তি বা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার অবনতিসহ আরও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে।
ঘাড়ের গঠন বদলে দিচ্ছে ফোন
যারা ফোন ব্যবহার করেন, তাদের অধিকাংশই মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই ভঙ্গিকে বলা হয় ‘সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা মাথার ভঙ্গি’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে থাকলে ঘাড়ের ওপর প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জয়েন্ট ও পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এই সমস্যাকে অনেকেই ‘টেক নেক’ নামে অভিহিত করেন।
এটি শুধু ব্যথার কারণ নয়, ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক গঠনও স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ব্যায়াম করলে এ সমস্যা কিছুটা ঠিক করা সম্ভব। তবে আরও সহজ সমাধান হলো ফোনটি চোখের সমান উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করা। স্ক্রিন মুখ থেকে প্রায় এক হাত দূরে রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। একই নিয়ম কম্পিউটারের মনিটরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাশাপাশি প্রতি আধা ঘণ্টা পর অন্তত ২০ মিনিট স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
ঘাড়ে বলিরেখা ও ত্বকের সমস্যা
মাথা নিচু করে ফোন ব্যবহারের কারণে কি ঘাড়ে বলিরেখা পড়ে?
যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেক্সটালের মতে, তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি সম্ভব। কারণ একই জায়গায় বারবার ভাঁজ পড়লে বলিরেখা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ঘাড় নিচু করে রাখার ফলে এমনটি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই টেক নেকের কারণে হওয়া বলিরেখা দূর করার নামে বাজারে বিক্রি হওয়া বিশেষ প্রসাধনী ব্যবহারের পরামর্শ তিনি দেন না।
তবে স্মার্ট ঘড়ি নিয়মিত ব্যবহারকারীদের জন্য অন্য ধরনের ত্বকের ঝুঁকি রয়েছে। ঘড়ির নিচে দীর্ঘ সময় অন্ধকার ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়, যা ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য উপযোগী। এর ফলে ত্বকে জ্বালা, প্রদাহ কিংবা একজিমা হতে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের মতে, এতে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঘড়িতে ব্যবহৃত নিকেল, রাবার, প্রাকৃতিক রাবারের উপাদান কিংবা অ্যালার্জি তৈরি হতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে তিনি নিয়মিত স্মার্ট ঘড়ি খুলে ত্বক পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন। দীর্ঘ সময় ঘড়ি পরতে হলে ত্বকে সুরক্ষামূলক ক্রিম ব্যবহার করাও উপকারী হতে পারে।
দৃষ্টিশক্তির অবনতির পেছনে কী শুধু ফোন?
বিশ্বজুড়ে কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের জিনিস ঝাপসা দেখার সমস্যার হার গত কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে। অনেকেই এর জন্য স্মার্টফোনকে দায়ী করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষুবিজ্ঞান অধ্যাপক ডোনাল্ড মিউটির মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
তিনি জানান, শিশুদের চোখের বিকাশ নিয়ে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ফোন বা বইয়ের মতো কাছের জিনিসে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার সঙ্গে এই সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক খুব শক্তিশালী নয়।
বরং গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে খোলা পরিবেশে বেশি সময় কাটানো চোখের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, বাইরের উজ্জ্বল আলো চোখের রেটিনা থেকে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা চোখের স্বাভাবিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি মানুষকে ঘরের ভেতর বেশি সময় কাটাতে বাধ্য করছে। ফলে পরোক্ষভাবে দৃষ্টিশক্তির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে তিনি নিয়মিত বাইরে সময় কাটানোর পরামর্শ দেন। এতে শুধু চোখ নয়, ঘুমের মানও ভালো হয়। তবে বাইরে গেলে অবশ্যই রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য সানস্ক্রিন ও রোদচশমা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি।
কমে যাচ্ছে হাতের শক্তি
হাতের মুঠোর শক্তিকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কারও হাতের মুঠোর শক্তি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির ভালো পূর্বাভাস দিতে পারে।
জার্মানির চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহানেস বেলারের মতে, বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হাতের শক্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি শুধু হাত দুর্বল হওয়ার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকির আগাম সংকেত হতে পারে।
তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় কম্পিউটারনির্ভর বসে কাজ করার অভ্যাস মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং এর প্রভাব হাতের শক্তিতেও পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টেনিস বল সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেপে অন্তত ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড ধরে রাখতে পারা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে কবজির বিশেষ ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত শরীরচর্চা ও ব্যায়াম করা।
হাত–চোখের সমন্বয়েও নেতিবাচক প্রভাব
প্রযুক্তি মানুষের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম দক্ষতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
জার্মানির বিকাশমনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সেবাস্টিয়ান সুগাটে বলেন, প্রযুক্তি হয়তো মানুষকে চাপ দেওয়া, স্পর্শ করা বা স্ক্রিনে আঙুল চালানোর মতো নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ করে তুলছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও বেশি তথ্য পাওয়া গেছে। তার নিজের গবেষণাতেও দেখা গেছে, স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানো শিশুদের মোটর দক্ষতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
এই বিষয়টি উদ্বেগের, কারণ শিশু ও কিশোরদের মোটর দক্ষতার সঙ্গে তাদের মেধা, শেখার ক্ষমতা ও শিক্ষাগত অগ্রগতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে তিনি আতঙ্কিত হওয়ার বা পুরোপুরি স্ক্রিন নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেন না। বরং প্রতিদিনের জীবনে সচেতনভাবে হাতে-কলমে কাজ, খেলাধুলা, আঁকাআঁকি, হস্তশিল্প কিংবা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন, যাতে শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সমন্বয় বজায় থাকে।


