পাচারের অন্ধকার পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে এক যুবকের রূপকথা

পাচারের অন্ধকার পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে এক যুবকের রূপকথা
ইকুয়েডরের বিপক্ষে আইভরিকোস্টের জয়ের নায়ক আমাদ দিয়ালো। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

মাঠের খেলা তখন ৯০ মিনিটে ঠেকেছে। পুরো স্টেডিয়ামে পিনপতন নীরবতা। ঠিক সেই মুহূর্তে ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ ভেঙে বলটি জালে জড়িয়ে দিলেন আমাদ দিয়ালো। গ্যালারি জুড়ে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। আইভরি কোস্ট পেয়ে গেল এক শূন্য গোলের দারুণ এক জয়। কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তরুণ উইঙ্গারের কাছে এই গোলটি শুধু দলকে জেতানোর তিন পয়েন্ট ছিল না। এটি ছিল তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব, কেড়ে নেওয়া পরিচয় আর এক অন্ধকার অতীতের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের গল্প।

আট বছরের একটা বাচ্চার জীবন কেমন হওয়ার কথা? মা-বাবার আদর, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর এক আকাশ স্বপ্ন। কিন্তু ২০১০ সালে আইভরি কোস্টের ছোট্ট দিয়ালোর জীবনে নেমে আসে এক ঘোর অন্ধকার। তিনি এক মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েন। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজার তরুণকে ফুটবলার বানানোর লোভ দেখিয়ে ইউরোপে পাচার করা হয়। এই অপরাধীরা মূলত শিশুদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে পুঁজি করত। ইমিগ্রেশনের চোখ ফাঁকি দিতে তারা বাচ্চাদের ভুয়া নাম ও পরিচয়পত্র বানাত। তারপর সম্পূর্ণ অচেনা কিছু মানুষের সঙ্গে তাদের জুড়ে দিয়ে সাজানো এক পরিবার বানিয়ে দিত। দিয়ালোর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। পাচারকারীরা দুনিয়া থেকে তার আসল পরিচয় মুছে দিয়েছিল।

বছরের পর বছর এক মিথ্যা পরিচয়ের বেড়াজালে বন্দি ছিলেন দিয়ালো। এমনকি ভুয়া কাগজপত্রের কারণে ফুটবল দুনিয়াও দীর্ঘদিন ধরে আরেক পেশাদার ফুটবলার হামেদ জুনিয়র ত্রাওরেকে তার আপন ভাই বলে জানত। নিজের আসল শিকড় কোথায়, কারা তার জন্মদাতা মা-বাবা, সেই সত্য এখন পর্যন্ত দিয়ালোর কাছে এক মস্ত বড় রহস্য। যে চক্রটি তার জীবনকে এভাবে ওলটপালট করে দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে ইতালির পুলিশ তাদের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। ততদিনে দিয়ালোর জীবনের একটা বড় অংশ হারিয়ে গেছে এক গভীর অনিশ্চয়তার অতলে।

সাধারণ কোনো মানুষ হলে হয়তো এই মানসিক কষ্ট আর নির্যাতনের নিচে চাপা পড়ে যেতেন। কিন্তু দিয়ালো হার মানেননি। যে দেশ থেকে পাচারকারীরা তাকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছিল, বুকের ভেতর সেই আইভরি কোস্টের টান তিনি কখনো ভোলেননি। ফুটবলকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি লড়াই করেছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার জন্য। ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচের ওই গোলটি তাই কোনো সাধারণ গোল ছিল না। ওটা ছিল সব অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক বিজয়ের চিৎকার।

অপরাধী চক্রগুলো একসময় তাঁর জীবনটাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দিয়ালো আজ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকা। আইভরি কোস্ট এখন জার্মানির বিপক্ষে পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর ইকুয়েডর ভাবছে কুরাসাওকে নিয়ে তাদের নতুন কৌশল। তবে এই সব জয় পরাজয়ের হিসাব ছাপিয়ে দিয়ালো এখন এক অপরাজেয় নায়কের নাম। ফুটবল মাঠের চাকচিক্যের আড়ালে যে কতটা নির্মম বাস্তব লুকিয়ে থাকে, আমাদ দিয়ালোর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad