নদীর বুকে বিলীন ঘরবাড়ি, রেহাই পাচ্ছে না প্রিয়জনের কবরও

নদীর বুকে বিলীন ঘরবাড়ি, রেহাই পাচ্ছে না প্রিয়জনের কবরও
ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে তিনবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ফেনীর সোনাগাজীর আবুল কাশেম। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ষাটোর্ধ্ব আবুল কাশেমের ঘরবাড়ি সোনাগাজীর চর গোপালগাঁওয়ের ছোট ফেনী নদীর তীরে। গেল এক বছরে তিনবার নদীগর্ভে হারিয়েছেন নিজের ঘর। এখন কোনোরকমে একটি ছাউনি তুলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তার। কিন্তু সেই আশ্রয়টুকুও যেকোনো সময় নদীর বুকে মিলিয়ে যেতে পারে–এই শঙ্কাতেই কাটে প্রতিটি রাত।

দিশেহারা কাশেম বলছিলেন, ‘তিনবার ভিটেমাটি গেছে নদীতে। সব তো গেল, বাকিটাও কি টিকবে না!’

একই পাড়ার রোকেয়া বেগমের কষ্ট যেন আরও গভীর। ভিটেমাটির সঙ্গে নদীগর্ভে চলে গেছে তার স্বামীর কবরও। এখন সন্তানদের নিয়ে বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করার সুযোগটুকুও নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘হুতি জিরে (ছেলে-মেয়েকে নিয়ে) লই সাগরে ভাসিয়ের। এ বাচনরে (বাঁচা) বাঁচন কয় না।’

চলমান বর্ষায় টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে নদীভাঙনের মুখে পড়েছে ফেনীর কয়েকটি উপজেলা। ছোট ফেনী, ফেনী ও কালীদাস পাহালিয়া নদীর তীরজুড়ে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও সড়ক। নাজুক অবস্থায় রয়েছে ফেনীর সোনাগাজী, দাগনভূঞা ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকার লাখো মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের বন্যায় ভেঙে যাওয়া মুসাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ ছাড়া এই ভাঙনের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

অব্যাহত নদীভাঙনে তিন দিক থেকে নদীবেষ্টিত সোনাগাজী উপজেলা ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। ছোট ফেনী নদীর তীরবর্তী চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চরবদরপুর, কুঠিরহাট, কাটাখিলা, কালীমন্দির, চরদরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদরবেশ, আদর্শ গ্রাম, পশ্চিম চরদরবেশ, কাজীরহাট, স্লুইসগেট, আউরারখীল জেলেপাড়া, আলামপুর, তেল্লারঘাট, ইতালি মার্কেট ও ধনীপাড়া; চরচান্দিয়ার সাহেবের ঘাট, মোল্লারচর, পশ্চিম চরচান্দিয়া, বগদানানার আলমপুর, আউরারখীল এবং আমিরাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর, বাদামতলী, গুচ্ছগ্রামসহ বেশ কয়েকটি এলাকার ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন ভাঙনের হুমকিতে।

এ ছাড়া দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের বাগেরহাট, রামানন্দপুর, সালামনগর, জেলেপাড়া, তালতলী ও করিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে মানুষের।

আরও পড়ুন

সোনাগাজীর কাজীরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল মানুষের বসতি, এখন সেখানে শুধু নদীর পানি। ঘর নেই, টিউবওয়েল নেই, চলাচলের রাস্তাও হারিয়ে গেছে। সব হারিয়ে অনেকেই এখন আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে।

স্থানীয় কবির আহম্মদ বলেন, ‘কিছুই আর বাকি নেই, সব গেছে নদীতে। এখন থাকি মাইনষের (অন্যের) বাড়িতে।’

ফেনীর সোনাগাজীর চরমজলিশপুর, চরদরবেশ, চরচান্দিয়া ও অন্যান্য চরাঞ্চল, দাগনভূঞার মাতুভূঞা, ফেনী সদরের বালিগাঁও ইউনিয়ন এবং নোয়াখালীর মুসাপুর ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। বর্ষার পানি আর নদীর স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে।

ফেনীতে ২০ কিলোমিটারের বেশি এবং নোয়াখালীতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন চলছে। গত দুই বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তিন শতাধিক ঘরবসতি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনের পর ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু ভাঙনের আগে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। আগে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হতো। তাদের মতে, জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক সমাধান মিললেও স্থায়ী সমাধান নয়। তাই দ্রুত মুসাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা মনির আহাম্মদ বলেন, ‘মুসাপুর ক্লোজার ভেঙেছে ২০২৪ সালের বন্যায়। দুই বছর অতিবাহিত হলো, এখনো সেটি নির্মাণের খবর নেই। ক্লোজারটি পুনর্নির্মাণ করা গেলে বিশাল এলাকার মানুষের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন স্থানে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ছোট ফেনী ও ফেনী নদীর তীর সংরক্ষণে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।

এ ছাড়া, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বি-স্ট্রং প্রকল্পের আওতায় দুই নদীর প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনরোধে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মুসাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। তীরবর্তী মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’

স্থানীয়দের তথ্যমতে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুসাপুর রেগুলেটরটি গত বছরের ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে জোয়ারের সময় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার লবণাক্ত পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আবার ভাটার সময় তীব্র স্রোতের তোড়ে ভেঙে যাচ্ছে নদীতীর।

নদীপাড়ের মানুষের কথা একটাই–প্রতিশ্রুতি নয়, এবার কাজ শুরু হোক। কারণ প্রতিটি জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শুধু ঘরবাড়ি বা জমি হারিয়ে যাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের শেকড়, স্মৃতি আর প্রিয়জনের কবরও।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad