বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলীয় কর্মকাণ্ড অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে দলকে চাঙা করতে ঢাকা মহানগর বিএনপি কমিটিতে বড় রদবদলের আভাস দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজধানীকেন্দ্রিক সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির বর্তমান কমিটির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। এরইমধ্যে দলটির অভ্যন্তরে নতুন নেতৃত্ব গঠন নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিতে রফিকুল আলম মজনুকে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব করা হয় তানভীর আহমেদ রবিনকে।
ঢাকা মহানগর উত্তরে আহ্বায়ক করা হয় জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবকে, সদস্য সচিব করা হয় আমিনুল হককে। তবে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে পরবর্তীতে মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি।
সাধারণত মহানগর বিএনপির মেয়াদ হয়ে থাকে চার বছর। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর অনেক সময় এই মেয়াদ বাড়ে অথবা কমে।
দলীয় সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, রাজপথের শক্ত কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল সামনে রেখে মহানগর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে বড় ধরনের রদবদল আসতে পারে। এ অবস্থায় নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার জন্য প্রবীণ ও দলের হাইকমান্ড নেতাদের কাছে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নেতাদের দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বিএনপি ও বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের সারা দেশের প্রায় ৯০০ শীর্ষ নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৈঠকে তিনি সংগঠনের কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করার নির্দেশনা দেন এবং বিভিন্ন ইউনিটে নতুন নেতৃত্ব আনার ইঙ্গিত দেন বলে জানিয়েছেন উপস্থিত নেতারা। এরপর থেকেই সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বেড়ে গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে আরো কার্যকর করতে পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত শুরু হবে। সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়াতে শিগগির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি কবে নাগাদ হতে পারে সে বিষয়জে জানতে চাইলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী টাইমসকে বলেন, নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের কথা তার জানা নেই।
তবে দলীয় নেতাদের ভাষ্য, এবার নেতৃত্ব বাছাইয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও দলের প্রতি আনুগত্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলেছেন এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন–তাদেরই সামনে আনার চিন্তা করছে হাইকমান্ড।
পাশাপাশি সংসদ ও রাজপথে বক্তব্য দেওয়ার সক্ষমতা, কর্মীদের নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্ভাব্য নেতারা ইতোমধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মামলা-হামলা, আন্দোলনে ভূমিকা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার বিবরণ তুলে ধরে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। গুলশান কার্যালয়সহ দায়িত্বশীল নেতাদের কাছেও চলছে তদবির। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় উপস্থিতিতে বাড়িয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
মহানগর উত্তরে আলোচনায় যারা
মহানগর উত্তর বিএনপির সম্ভাব্য নেতৃত্বে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান আহ্বায়ক আমিনুল হক, এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, মোস্তফা জামান, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং এবিএম আব্দুর রাজ্জাক।
সভাপতি পদে আমিনুল হকের ওপর আস্থা রাখতে চান মহানগর উত্তরের একটি বড় অংশের নেতাকর্মী। তাদের দাবি, তার নেতৃত্বে সংগঠন আরও সুসংগঠিত হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সক্রিয়তা বেড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন বলেও তারা উল্লেখ করেন। থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটি গঠনে তার ভূমিকার কথাও সামনে আনছেন সমর্থকরা।
অন্যদিকে, এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সাংগঠনিক দক্ষতা ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ ঢাকা-১৮ আসনে তার রাজনৈতিক অবস্থান দলীয় কৌশলের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নেতারা।
যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসানের নামও নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা, একাধিক মামলা-হামলার মুখোমুখি হওয়া এবং আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তরুণ নেতাদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলে দাবি দলীয় সূত্রের।
এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপি সবসময় যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন এবং সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের নিয়েই শক্তিশালী টিম গঠন হবে। সরকার ও সংগঠনের কাজ সমন্বয় করেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব বলে জানান জাহাঙ্গীর হোসেন।
দক্ষিণের আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটি নিয়েও আলোচনা তুঙ্গে। সম্ভাব্য নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুগ্ম-আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ, রফিকুল আলম মজনু, যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং বিএনপি নেতা কাজী আবুল বাশারসহ আরও কয়েকজন। তবে দলীয় আলোচনায় তানভীর আহমেদ রবিন ও লিটন মাহমুদের নাম তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালামের নামও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
দক্ষিণ বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, তানভীর আহমেদ রবিন বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অসংখ্য মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি ও তার পরিবার। দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থাকায় তৃণমূলেও তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে, লিটন মাহমুদ নিজেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। দলের দুঃসময়ে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করছেন। নিয়মিত মিছিল, পিকেটিং ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার বিষয়টিও সামনে আনছেন তিনি।
দীর্ঘদিন দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কাজী আবুল বাশারও আলোচনায় রয়েছেন। হামলা-মামলার মধ্যেও রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক তাকে এখনো আলোচনায় রেখেছে। যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাননি, তবুও তার অনুসারীরা মনে করছেন নতুন কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন।
কমিটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তানভীর আহমেদ রবিন টাইমসকে বলেন, দলের কমিটি গঠন সম্পূর্ণভাবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এখতিয়ার। তবে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন, দল নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে সবাই মিলে কাজ করছছেন বলেও জানান রবিন।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, এবার মহানগর কমিটিতে শুধু পুরোনো মুখ নয়, আন্দোলনে পরীক্ষিত ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নতুন নেতাদেরও জায়গা দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থেকেছেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং দলীয় সংকটে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন–তাদের মূল্যায়নের সম্ভাবনাই বেশি।
এদিকে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
দলীয় নেতাদের মতে, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটি শুধু সাংগঠনিক রদবদল নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আন্দোলন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং কৌশলগত পুনর্গঠনের অংশ। তাই নেতৃত্ব বাছাইয়ে এবার ব্যাপক যাচাই-বাছাই চলছে।
শেষ পর্যন্ত কারা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসছেন, তা নির্ভর করবে দলের হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ, আগামীতে ঢাকা উত্তর সিটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য বিএনপির এই মহানগর কমিটির নেতাকর্মীর ওপর অনেক দায়িত্ব পড়বে।
যারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপকভাবে কাজ করতে পারবে। আগামী দিনে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা মজবুত করার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী পক্ষকে মোকাবিলা করার কৌশলকে সামনে রেখেই ঢাকা মহানগর নতুন কমিটি গঠনের ওপর জোর দিয়েছে বিএনপি হাইকমান্ড।


