জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তার সফর ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার আসন্ন বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের নতুন করে চীনের বাজারে প্রত্যাবর্তনের আশা ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বোয়িং কেনার ক্ষেত্রে চীন এখনো পুরোপুরি আগ্রহী নয়। তবে দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে।
বোয়িং এখন চীনের পক্ষ থেকে নতুন করে শতাধিক উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি অর্জনের পরিবর্তে গত মে মাসে হওয়া ২০০ উড়োজাহাজ বিক্রির সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন দুই ব্যক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকের সময় প্রাথমিকভাবে হওয়া ওই চুক্তির ফলে চীনের উড়োজাহাজ বাজারে আবারও প্রতিযোগিতায় ফিরতে পেরেছে বোয়িং।
২০১৭ সালের পর থেকে চীনের বাজারে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এই উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। বিপরীতে ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস বিশ্বের অন্যতম বড় উড়োজাহাজ বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের বাজার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত চীনের প্রায় নয় হাজার নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে, যা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি।
চলতি বছর ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দুটি বৈঠককে কেন্দ্র করে বোয়িংয়ের নতুন বড় ধরনের চুক্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সে সময় বোয়িং, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ৫০০টি পর্যন্ত উড়োজাহাজ বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
মে মাসে শি-ট্রাম্প বৈঠকের পর বোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গ বলেছিলেন, ২০০ উড়োজাহাজের চুক্তিটি ছিল আরও বড় অর্ডারের প্রথম ধাপ। তার মতে, চীনের বাজার আবার উন্মুক্ত হওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে নতুন বড় কোনো চুক্তি হতে পারে বলে বিনিয়োগকারী ও উড়োজাহাজ বিশ্লেষকেরা আশা করেছিলেন। তবে গত সপ্তাহে অর্টবার্গ সেই সম্ভাবনা কমিয়ে দেখিয়েছেন।
মহাকাশবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যারোডাইনামিক অ্যাডভাইজরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড আবুলাফিয়া বলেন, ‘চীনের সঙ্গে ২০০টি উড়োজাহাজের চুক্তি টিকে থাকাই হবে একটি সাফল্য।’
চীনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কর্মকর্তা স্কট কেনেডি বলেন, এই বৈঠকে নতুন উড়োজাহাজ চুক্তি করা শীর্ষ অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তারা মূলত বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি এবং সয়াবিন ও বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
কেনেডি বলেন, ‘অনেক বাণিজ্য সম্পর্ক এসব বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে। নতুন উড়োজাহাজ অর্ডার হলে তা বাড়তি সুবিধা হবে, তবে এই বৈঠকের জন্য এটি অপরিহার্য নয়।’
বোয়িং গত সপ্তাহে অর্টবার্গের মন্তব্যের বাইরে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে দেশটির দূতাবাস মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আরও দুই মাস বাড়াতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বড় বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই সময় বাড়ানো হয়েছে।

গত কয়েক বছরে চীনের বাজারে বোয়িংয়ের চেয়ে বেশি অগ্রগতি করেছে এয়ারবাস। সিঙ্গাপুরভিত্তিক উড়োজাহাজ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনডাউ অ্যানালিটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা শুকোর ইউসুফ বলেন, এর পেছনে একটি কারণ হলো চীনের তিয়ানজিনে এয়ারবাসের নিজস্ব চূড়ান্ত সংযোজন কারখানা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের তুলনায় চীন ও ইউরোপের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় এয়ারবাস সুবিধা পেয়েছে। আমাদের অঞ্চলে বোয়িং তার প্রভাব অনেকটাই হারিয়েছে। এর পেছনে আংশিকভাবে রাজনীতি দায়ী হলেও মূল কারণ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমস্যা।’
তবে বোয়িং ও চীনের মধ্যে অগ্রগতির কিছু সম্ভাবনা এখনো রয়েছে, বিশেষ করে মে মাসে ঘোষিত ২০০ উড়োজাহাজের চুক্তি নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার সোমবার ফক্স নিউজকে বলেন, প্রায় ১৪০টি উড়োজাহাজের অর্ডার ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং আরও ১০টি অর্ডারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত একজন ব্যক্তি জানান, চুক্তির কিছু অংশের চূড়ান্ত বিষয়গুলো বৈঠকের সময় ঘোষণা করা হতে পারে, যদি প্রয়োজনীয় চুক্তিপত্র সম্পন্ন করা যায়।
তবে চুক্তি সইয়ের আগে চীনের মধ্যে উদ্বেগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে কি না। কারণ এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছিল।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মে মাসে জানিয়েছিল, বোয়িংয়ের চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে।


