গুমের বিচার ও প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশকে দুর্বল করে নতুন আইন করার উদ্যোগের অভিযোগ তুলে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন গুমের শিকার ব্যক্তি, তাদের স্বজন ও ১১ দলীয় জোটের নেতারা।
তাদের অভিযোগ, গুমের সঙ্গে জড়িতদের দিয়েই তদন্তের সুযোগ রেখে এবং অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান রেখে আইন করা হলে তা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন করে তুলবে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রোববার রাজধানীর বাংলামোটর থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি।
কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন। পদযাত্রা শেষে জাতীয় সংসদের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে একটি প্রতিনিধিদল স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেয়।
সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ কোনো ধরনের কাটছাঁট ছাড়াই আইনে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব না দিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান তারা।
পদযাত্রার আগে বাংলামোটরের রূপায়ন ট্রেড সেন্টারের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ আমলে গুমের শিকার সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান।
তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার দাবি জানান।
সমাবেশে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত আইনে অভিযোগকারী গুমের ঘটনা প্রমাণ করতে না পারলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।’
তার প্রশ্ন, গুমের মতো একটি ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহের সক্ষমতা একজন ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের কতটুকু থাকে।
গুমের বিচার করতে হলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিয়েই প্রমাণের পুরো ভার বহন করানো যাবে না। তার দাবি, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গুম কমিশনের প্রস্তাবিত আইন হুবহু কার্যকর করতে হবে এবং গুমের শিকার পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিমও একই অভিযোগ তুলে বলেন, বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত আইনে পুলিশকে গুমের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া এবং অভিযোগকারী প্রমাণ দিতে না পারলে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এসব বিধানকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
এবি পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব মিনার বলেন, গুমের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের সুযোগ বন্ধ করতে হলে শক্তিশালী আইন প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খসড়া আইনে থাকা ত্রুটিগুলো সংশোধন করে কার্যকর গুম প্রতিরোধ আইন করার দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে গুম ও নির্যাতনের শিকার একাধিক ব্যক্তি তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
সাবেক কূটনীতিক ও গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সদস্য সাকিব আলী গুম ও খুনের শিকার ব্যক্তিদের দেহাবশেষ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। তার অভিযোগ, গুম-খুনের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের বিচার না হলে ভবিষ্যতে আবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকবে।
পদযাত্রাটি বাংলামোটর থেকে কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসিনুর রহমান ও শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেয়।
স্মারকলিপিতে অন্তর্বর্তী সরকারের গুম কমিশনের প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশ কোনো পরিবর্তন ছাড়া আইনে পরিণত করা, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন, গুমের অভিযোগ প্রমাণের ভার ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে না দেওয়া, নিখোঁজদের সন্ধান এবং গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়।
সমাপনী ব্রিফিংয়ে হাসিনুর রহমান বলেন, স্পিকার তাদের দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী ৫ তারিখে তাদের পরবর্তী বড় কর্মসূচি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।


