অনলাইনে নারী ও শিশু সুরক্ষার কথা বলে সাইবার আইনে যে সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদরা। তাদের অভিযোগ, সুরক্ষার আড়ালে মূলত মানহানি, গুজব ও অপতথ্যের মতো অস্পষ্ট শব্দ যুক্ত করে আগের নিবর্তনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) মতোই ভিন্নমত ও নাগরিকদের টুঁটি চেপে ধরার পাঁয়তারা চলছে।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত ‘বাকস্বাধীনতা প্রশ্নে সংশোধিত সাইবার আইন কতটুকু বিতর্কিত, কতটুকু ডিএসএ-র প্রতিচ্ছবি?’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এ ধরনের আইন তার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
সংগঠনটির সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস।
সুরক্ষার নামে কার্টুন আঁকায় শাস্তির খড়গ
মূল প্রবন্ধে নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনলাইনে নারী ও শিশু সুরক্ষা পর্যাপ্ত না থাকায় আইন সংশোধনের কথা বলেছিলেন। অথচ বর্তমানে কার্যকর আইনেই যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন ও শিশু নিপীড়নসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশোধনীতে ভুক্তভোগী নারীদের ছবি ইন্টারনেট থেকে দ্রুত অপসারণের মতো জরুরি বিষয় যুক্ত না করে, রাজনীতিবিদদের কার্টুন আঁকার ক্ষেত্রে শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে নারী-শিশু সুরক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এর উদ্দেশ্য নাগরিকের অধিকার সীমিত করা।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ‘বাকস্বাধীনতা ও বাকশালীনতার’ পার্থক্যের বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যখন নিজে অশালীনতার বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। বাকস্বাধীনতা হলো ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকের অধিকার। ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী থানায় একই ‘কপি-পেস্ট’ ভাষায় মামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব আইনের উদ্দেশ্য বিচার নয়, বরং রিমান্ড ও হয়রানির মাধ্যমে মানুষের মুখ বন্ধ রাখা।
ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি গোলাম মাহফুজ অভিযোগ করেন, সংশোধনীতে সাইবার হয়রানি বা ডার্ক ওয়েবে তথ্য ফাঁস থেকে নাগরিকদের সুরক্ষার কোনো স্পষ্ট বিধান নেই; উল্টো মানহানির ধারা ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানহানির অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে যে কেউ অভিযোগ করতে পারবে এবং তদন্তের নামে ফোন-সার্ভার জব্দ করা হবে।’ নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গুম-ক্রসফায়ারের প্রতিবাদে ১০০ দিনের কর্মসূচি শেষে ডিজিএফআইয়ের ফোনের পর র্যাব তাকে আটক করেছিল। ১০ মাস কারাভোগের পর চার বছর লেগেছে মামলা নিষ্পত্তি হতে। সরকারের নীতির সমালোচনা প্রতিষ্ঠানের মানহানি হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
‘১৯৭১-এর সিনড্রোম’ ও জনপ্রত্যাশা বুঝতে না পারার শঙ্কা
সংলাপে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন বর্তমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে ‘জেন্টলম্যানস এগ্রিমেন্ট’ হয়েছিল, তা মানা হচ্ছে না। ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে লেখক মুশতাক আহমেদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অতীতের মতো একই ছাঁচে এজাহার তৈরির ঝুঁকি আবারও তৈরি হয়েছে। নির্দোষ প্রমাণিত হলেও বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের যে হয়রানি, তা আর পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না।
বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৭১-পরবর্তী ‘সিনড্রোমের’ সঙ্গে তুলনা করে এই রাজনীতিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগারে থাকায় যুদ্ধকালীন বাস্তবতার সঙ্গে তার একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। একইভাবে দীর্ঘ সময় নির্যাতন ও নির্বাসনে থাকায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমেদের পক্ষেও গণঅভ্যুত্থানের সময়কার মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে রাশেদ খান কী ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মাগুরা উপনির্বাচন ও বিচারকদের অবসরের বয়স বৃদ্ধির অতীত উদাহরণ টেনে তিনি সতর্ক করেন, গত ১৭ বছরে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত দল বিএনপিও ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় ভোগে। দমনমূলক আইন ফেরালে তা অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী হবে।
প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ ও শাস্তির বৈষম্য
অল্টারনেটিভের সংগঠক তাজনুভা জাবীন বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১২ নম্বর দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে ভিন্নমত দমনের আইন বাতিলের অঙ্গীকার ছিল। খোদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে এই আইনে চার্জশিট হয়েছিল। অথচ কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার পেছনের দিকে হাঁটছে।
তিনি আইনের শাস্তির বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার সাজা দুই বছর, অথচ গুজব বা অপতথ্যের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ বছর! মেহেরপুর ও সিলেটে ফেসবুকে কটূক্তির কারণে দুই যুবকের আটকের ঘটনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার জনগণের গালিগালাজ অপছন্দের মনোভাবকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। তিনি প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রত্যাহারের দাবি জানান।
তাড়াহুড়ো করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) গবেষণা উপদেষ্টা ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী আইন পাসের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, ১৩ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত মাত্র আট কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে গণপরামর্শের জন্য, যা মৌলিক অধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের জন্য প্রহসনমূলক।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের বদলে দেওয়ানি প্রতিকারের দিকে নেওয়া হচ্ছে। ১৪ বছরের শিশুর কার্টুন আঁকা বা কোভিডকালে ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে আটকের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো অনুযায়ী ‘অপমানিত বা বিরক্ত’ করার মতো বক্তব্যও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে। অপতথ্য ঠেকাতে আটটি দেশে ফৌজদারি আইন করে ব্যর্থ হওয়ার উদাহরণও দেন তিনি। এছাড়া কনটেন্ট ব্লক করতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সংস্থাগুলোকে দেওয়া নির্বাহী ক্ষমতা বাকস্বাধীনতাকে আরও হুমকির মুখে ফেলবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন বলেন, দমনমূলক কালো আইন দিয়ে ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; প্রয়োজন সুশাসন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের আমলের গুমসংক্রান্ত আইন, নখদন্তহীন মানবাধিকার কমিশন কাঠামো এবং ডিএসএ’র মতো আইন ফিরিয়ে আনে, তবে মানুষের কাছে দুই দলের রাজনীতির কোনো পার্থক্য থাকবে না।
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ, ডেইলি ওয়াদার ম্যানেজিং এডিটর ফয়সাল মাহমুদ, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, সপ্রাণের রিসার্চ ডিরেক্টর জারিফ রহমান এবং দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জায়মা ইসলাম।


