কংক্রিটের ঢাকায় পাখিদের ঠিকানা জেলা প্রশাসনের ‘আকাশ নীড়’

কংক্রিটের ঢাকায় পাখিদের ঠিকানা জেলা প্রশাসনের ‘আকাশ নীড়’
ছবি: সৌজন্যে
Advertisement
Advertisement

ঢাকার কংক্রিটের জঙ্গলে যখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সবুজ আর হারিয়ে যাচ্ছে পাখির নিরাপদ আশ্রয়। সেই ভাবনা থেকেই নগরী জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।

‘পাখির রাজ্যে স্বাগতম’ স্লোগানকে সামনে রেখে  জেলা প্রশাসকের ছাদে গড়ে তোলা হয়েছে ‘আকাশ নীড়’। যেখানে সবুজ, ফুল-ফল, জলাধার, পাখির খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে পাখি ও মানুষের সহাবস্থানের পরিবেশ। নগরের ব্যস্ততা ও কংক্রিটের বিস্তারের মধ্যেও পাখিদের জন্য নিরাপদ আবাস এবং মানুষের জন্য প্রকৃতির সান্নিধ্য নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

বুধবার ‘আকাশ নীড়ের’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরীতে সবুজের জন্য একটু জায়গা, নির্মল বাতাসের জন্য একটু অবকাশ এবং পাখির কিচিরমিচির শোনার মতো শান্ত পরিবেশ দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবে উদ্যোগ, ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে কংক্রিটের শহরের বুকেও সবুজের পরশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘আকাশ নীড়’ শুধু একটি ছাদবাগান নয়; নগরজীবনে সবুজ, জীববৈচিত্র্য ও পাখির নিরাপদ আবাস ফিরিয়ে আনার একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ প্রয়াস। এখানে এমন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে পাখি শুধু আসবে না, নিরাপদে আশ্রয় নেবে, খাবার পাবে এবং নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে পারবে।

জেলা প্রশাসক জানান, ‘আকাশ নীড়ে’ রয়েছে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ। এর মধ্যে পাখিদের খাদ্যের উৎস ও পরাগায়নের জন্য রয়েছে ৩০ প্রজাতির ২২৯টি ফুলের গাছ। রয়েছে ১৪ প্রজাতির ৪১টি ফলের গাছ, যা পাখিদের জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস তৈরি করবে। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করতে রাখা হয়েছে ১১ প্রজাতির ৪৪টি অর্নামেন্টাল গাছ।

আরও পড়ুন

পাখিদের জন্য পদ্ম ও শাপলায় সাজানো জলাধারের পাশাপাশি রয়েছে বার্ডস বাথ। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে বাঁশের কৃত্রিম ঝোপঝাড় ও পাখির ঘর। বড় ক্যানোপিযুক্ত গাছও রাখা হয়েছে পাখিদের বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য। স্থানীয় খরগোশ, বানর ও কাঠবিড়ালির জন্যও রয়েছে নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা।

ফরিদা খানম বলেন, ঢাকার প্রতিটি ভবনের ছাদ যদি একটু একটু করে সবুজ হয়ে ওঠে এবং মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করেন, তাহলে শহর আরও বাসযোগ্য, সুন্দর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, প্রকৃতি রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। সবুজ শুধু সৌন্দর্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাণ, সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, নগরায়ণের ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সবুজ এলাকা ও জীববৈচিত্র্যের পরিসর। এ বাস্তবতায় ছাদবাগান শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়, নগরের পরিবেশ রক্ষায়ও এটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভবনের ছাদে সবুজায়ন এবং পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে এগিয়ে এলে সম্মিলিতভাবে নগরের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, ‘আকাশ নীড়’ মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।

শুধু পাখিদের জন্য নয়, নগরবাসীর জন্যও ‘আকাশ নীড়’ রাখা হয়েছে স্বস্তির একটি জায়গা হিসেবে। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক বিশ্রামস্থল। রয়েছে ছাতা ও কাঠের চেয়ার। ফুলের সুবাস, সবুজের সমারোহ আর পাখির কলতানে জায়গাটি হয়ে উঠেছে নগরজীবনে প্রশান্তির ছোট্ট এক পরিসর।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ‘আকাশ নীড়’কে শুধু একটি ছাদবাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ধারণা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। একটি ভবনের ছাদ থেকে শুরু হয়ে এ ধারণা ঢাকার অসংখ্য ছাদে ছড়িয়ে পড়লে কংক্রিটের নগরীতেও গড়ে উঠতে পারে সবুজের নতুন বলয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর