রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের ২৬টি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ২৪টিই অচল। এ ছাড়া তিনটি সিটি স্ক্যানের দুটি, তিনটি এমআরআই মেশিনের মধ্যে দুটি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি অচল। এই চিত্র ফুটে উঠেছে রোববার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালসহ তিন এমপির পরিদর্শনের ।
মাহবুবুর রহমান বেলালের সঙ্গে রোববার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী ও রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী ও হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান। এদিন বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড এবং বিভিন্ন মেশিনপত্রের রুম পরিদর্শন করেন তারা।
পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মেশিনপত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ময়লার স্তুপ দিয়ে ঢাকা। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। বিশেষ করে মেশিনপত্র নষ্ট থাকায় চিকিৎসা সেবায় হয়রানি হচ্ছে রোগীদের।
এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংসদ সদস্যদের জানান, অচল এক্সরে মেশিনের মধ্যে ২০টি মেরামত অযোগ্য। এছাড়াও দুটি করে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই এবং আটটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও মেরামতের অযোগ্য। দুটি আলট্রাসনোগ্রাম ও চারটি এক্সরে মেশিন মেরামত করে সচল করা যেতে পারে। এ ছাড়াও আইসিইউ বেড, অ্যাম্বুলেন্সসহ সব কিছুরই সংকট। এছাড়াও জনবল সংকটের কারণে দালালচক্রের সিন্ডিকেটে অতিষ্ঠ রোগী ও তাদের স্বজনরা।
এরপর তিন সংসদ সদস্য, পরিচালক, কর্মকর্তাসহ রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানান, চিঠি চালাচালি করেও অচল মেশিনগুলো রুম থেকে সরানো যাচ্ছে না। ফলে নতুন মেশিন স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া যাচ্ছে না।
এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন তারা তিন সংসদ সদস্য। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় মৃত রোগীর মরদেহ আটকে রেখে অভিযুক্ত ছেলেকে ‘কান ধরে উঠবস’ করানোর বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেন তারা।

হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে গোলাম রব্বানী বলেন, ‘একটা বিভাগীয় শহরের এতো বড় একটা হাসপাতালে যে চিত্র আমাদের কাছে ফুটে উঠেছে, এতক্ষণ যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আবার এই তিনজন দেখা করব ব্যক্তিগতভাবে। তার কাছে আমরা এই জিনিসগুলো উত্থাপন করব এবং অভিজ্ঞতা বলব। আমি আশা করি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং আমরা সম্মিলিতভাবে যদি এই কথাগুলো তুলে ধরি অবশ্যই এগুলোর সমাধান হবে ইনশাল্লাহ।’
রায়হান সিরাজী বলেন, ‘পরিদর্শনে এসে যা দেখা গেল এখানে সবচেয়ে বড় অব্যবস্থাপনার কারণ হলো জনবল ঘাটতি। এখানে ব্যবহারযোগ্য অনেক যন্ত্র রয়েছে। কিন্তু সেগুলো জনবলের ঘাটতির কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশে অর্থের অপচয় হচ্ছে আবার জনগণও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বেশ কয়েকটা স্টোর রুম ঘুরে দেখলাম। এ ব্যাপারে আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে এই রুমগুলো খালি করার ব্যাপারে আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করব ইনশাআল্লাহ।’
মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘এখানে জনবলের তীব্র সংকট আছে। সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসা সেবা ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে না, যাচ্ছে না। এখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। আমরা দেখলাম যে যন্ত্রপাতি যা ছিল খুবই কম। তার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে আছে। যেমন আমি দেখলাম যে ২৪টা এক্সরে মেশিন নষ্ট। এমআরই ও সিটি স্ক্যান মেশিন আছে তিনটি করে ছয়টি। তারমধ্যে চারটি অচল। আলট্রান্সগ্রামের ১৩টির মধ্যে ১০টিই অচল। এক্সরে মেশিনের মধ্যে চারটা মেরামতযোগ্য। আর ২০টা মেরামত করা যাবে না। কিন্তু ওই ২০টা যে নতুন দেবে এটার কোনো উদ্যোগ নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আইসিইউতে মাত্র ১০টা বেড। আপনারাই বলেন, পুরো আটটা জেলার রোগী যদি এখানে আসে রংপুরসহ তাহলে এই ১০টা বেড কি? এসব কারণে আমরা মিনিমাম সেবা দিতে পারছি না।’
এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘ স্টোর রুমে অনেক যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। সেগুলো সরানোর জন্য ওটা অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না বলে পড়ে আছে। তিন-চারটা রুম পড়ে আছে। অনেক নষ্ট জিনিস। এটা বিক্রি করে দেওয়া উচিত বা বাইরে বের করে দেওয়া উচিত। ওগুলো সরানোর না পর্যন্ত নতুন মেশিন আনার উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানে জনবল সংকটের কারণে মূলত দালাল চক্রের আধিপত্য চলছে। দালালদের কাছে আমাদের রোগীরা অসহায়। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা অত্যন্ত সিরিয়াসভাবে চেষ্টা করছি।’
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ‘হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিসহ তিন সংসদ সদস্যের কাছে আমরা আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছি এবং ও প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের কাছে দিয়েছি। আশা করছি শিগগিরিই এসব বিষয়ে সমাধান হবে।’


