ঢাকার হাজারীবাগের ১৩ বছর বয়সী সেই আলোচিত কিশোরী মায়ের সাত মাস বয়সী সন্তান আপাতত তার মায়ের কাছেই থাকবে। তবে কিশোরী মাকে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে বিরত থাকার শর্ত দিয়েছে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড। একই সঙ্গে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে শিশুর অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানি শেষে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মো. সায়েম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিশুর বয়স মাত্র সাত মাস হওয়ায় এবং তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আপাতত মায়ের জিম্মাতেই রাখা হচ্ছে।’
তিনি জানান, শুনানির সময় কিশোরী মাকে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইন মেনে চলতে উভয় পক্ষকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
লিগ্যাল এইড সূত্রে জানা গেছে, শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্ব চেয়ে বাবার করা আবেদন বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ফলে স্থায়ী অভিভাবক কে হবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে আদালত।
অভিযোগ রয়েছে, টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর ১৩ বছর বয়সী কিশোরীকে ফুসলিয়ে নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করা হয়। পরে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে জন্ম নেওয়া শিশুটিকেও মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে বিষয়টি আদালত ও প্রশাসনের নজরে আসে। পরে ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইডের উদ্যোগে মা ও শিশুকে এক করা হয় এবং শিশুর নিরাপত্তা, লালন-পালন ও ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার শুনানিতে লিগ্যাল এইডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিশুর তাৎক্ষণিক কল্যাণের স্বার্থে সে আপাতত মায়ের সঙ্গেই থাকবে। তবে স্থায়ী অভিভাবকত্বের প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত লিগ্যাল এইড নেবে না; বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত কিশোরী মা জুঁই এদিন তার বিয়ে অস্বীকার করে বলে, ‘আইনগতভাবে আমার বিয়ে হয়নি। শুধু নোটারি করে কিছু কাগজপত্র করা হয়েছিল। ওটা আইনগত বিয়ে নয়।’
জুঁই আরও জানায়, যে কাগজে সে সই করেছিল, সেটি আইনগত বিয়ের কাবিন ছিল না; বরং নোটারির মাধ্যমে করা একটি দলিল ছিল। তাই সে দাবি করে, আইন অনুযায়ী তার বিয়ে সম্পন্ন হয়নি।
ঢাকার লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে নির্ধারিত শুনানিতে অংশ নিতে আদালত এসে এসব কথা বলে সে।
এর আগে, আলোচিত এই ঘটনায় বিয়ের নথি, বয়স এবং সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে নানা বিতর্ক সামনে আসে। বিশেষ করে, বিয়ের সময় ব্যবহৃত নোটারি করা কাগজপত্র এবং আদালতে উপস্থাপিত বয়সসংক্রান্ত নথির মধ্যে অসঙ্গতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
জুঁইয়ের আইনজীবী মৃণাল কান্তি মিত্র বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে নোটারীর বিয়ে নামে কোনো বিয়ে নেই। তাদের বিয়ের পক্ষে যে সিল আছে সেই সিল হয়তো কেউ জালিয়াতি করে করেছেন। তাদের যে বয়স এই বয়সে কোনো আইনজীবী, কোনো কাজী বা কোনো ব্যক্তি এই বিয়ে করাবেন না। মেয়ে আবেগের কারণে বুঝেন নাই, তাই করে ফেলেছেন। তাকে ফুসলিয়ে বুঝিয়ে রাজি করানো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের নতুন ট্র্যাইবুনাল ঢাকা শিশু সহিংসতা দমন আইনে মামলা করব এবং এখানে তার স্বামীসহ সাত জনকে আসামি করা হবে।’
এর আগে, ভাইরাল হওয়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বয়সসংক্রান্ত নথিতে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে। আলোচিত যুবক শাকিল মিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বিয়ের সময় ব্যবহৃত কাগজপত্রে জুঁইয়ের বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আদালতের নথিতে তার বয়স ১৩ বছর উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নথির সত্যতা এবং বয়স জালিয়াতির অভিযোগ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।
পূর্ববর্তী শুনানিতে লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে কর্মকর্তার প্রশ্নের জবাবে জুঁই কোলে থাকা শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে স্বীকার করেছিলেন। সেই শুনানিতে দুই পক্ষ, তাদের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকেই বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।


