ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতসহ ১১ দলের আসন সমঝোতার জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বের হয়ে আসায় নির্বাচনী মাঠে বিএনপি জোট কিছুটা হলেও লাভবান হতে পারে। তবে, জামায়াত জোট ছেড়ে লাভবান হওয়ার পরিবর্তে নিজেদেরকে ক্ষতির দিকেই নিয়ে গেছে ইসলামী আন্দোলন।
শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াত জোট ছেড়ে ২৬৮ আসনে একক ভোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে রাজনীতির মাঠে লাভ-ক্ষতির হিসেবে মাঠের বাস্তবতা বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন অভিমত ব্যক্ত করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সারাদেশে ইসলামী আন্দোলনের কিছু সংখ্যক কর্মী সমর্থক রয়েছে। এককভাবে ভোট করায় দলটির ভোট এখন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা পাচ্ছেন না। তাই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা লাভবান হবেন।
মাঠের বাস্তবতা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী, চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এবং মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ৮ দলের আসন সমঝোতার জোটের খবরে দলগুলোর নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত এ জোটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ এর নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ায় ভোটের মাঠে আরো সাড়া জাগে।
পতিত আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় এ জোটকে নিয়ে অনেকে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার শ্লোগানে প্রথম থেকে ৮ দল মাঠে এক ধরনের সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বের হয়ে আসায় তাতে কিছুটা হলেও ভাটা নেমেছে।
যদিও জামায়াত জোটের ১০ দলের নেতাদের ভিন্ন যুক্তিও রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভোটের মাঠে বিএনপির নেতৃত্বাধীন একটি জোটের বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা থাকছে। তাই ইসলামী আন্দোলন জামায়াত জোটে থাকলে কিছু আসনে সমীকরণ ভিন্ন হতে পারতো। সেখানে জামায়াত জোটের প্রার্থী যদি ইসলামী আন্দোলনের পাঁচ হাজার বা তার কিছু ভোটও পেত তাহলে ওই আসনে জোটের প্রার্থী জয়ী হতে পারতো। তাই দৃশ্যত ইসলামী আন্দোলন একক ভোট করায় অনেক আসনে বিএনপি প্রার্থীরা সামান্য হলেও সুবিধা পাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই বললেই চলে। তাই এ দলটির সঙ্গে জামায়াতের পথচলা সহজ হতো না। সেদিক দিয়ে কিছুটা হলেও ভালো হয়েছে। আর জোট ছেড়ে একক ভোট করে ইসলামী আন্দোলনের ভালো করার এক শতাংশও কোনো সম্ভাবনা নেই।’
জামায়াতে ইসলামীর একজন সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, ‘ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে চলে যাওয়ায় খুব একটা প্রভাব পড়বে না। তবে, এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।’
এ জোটের অন্তর্ভূক্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ও দলের মুখপাত্র রাশেদ প্রধান টাইমকে বলেন, ‘জোটে ঐক্য বিনষ্ট হওয়ায় কিছুটা হলেও উভয় পক্ষের ক্ষতি হয়েছে। তবে, দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রেমীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশাবাদ তার।’
যে অভিযোগে জোট ত্যাগ ইসলামী আন্দোলনের
শুক্রবার বিকালে রাজধানীর পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেষ মুহূর্তে এসে জামায়াত জোট থেকে বের হয়ে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ওই ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র কাঙ্খিত আসন না পাওয়ার বিষয় নয়, যে উদ্দেশ্যে জোট গঠিত হয়েছিল সেখান থেকে জোটের বড় দল জামায়াতে ইসলামী বের হয়ে গেছে। প্রথমত ইসলামী আন্দোলনকে জামায়াত থেকে যথোপোযুক্ত সম্মান না দেওয়া, শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে কথা বলা অন্যতম। পাশাপাশি অন্যদেরকে না জানিয়ে এনসিপিসহ তিনটি দলকে যুক্ত করা এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান দেখা করে জাতীয় সরকার গঠনের আলোচনা জোটের নীতি বর্হিভূত।’
এদিকে, সন্ধ্যায় ইসলামি আন্দোলনের এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামির সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
১১ থেকে ১০ দলীয় জোট
গত বছরের ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রথমে চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ‘এক বাক্স’ ভোটের নীতিতে দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলে এ প্রক্রিয়ায় পরে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল যুক্ত হয়। একটা সময় সেটি ৮ দলীয় নির্বাচনী আসন সমঝোতায় রূপান্তরিত হয়। যার মধ্যে ছিল, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
দলগুলো একসঙ্গে নানা কর্মসূচি পালনের পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আসন সমঝোতার চেষ্টা করে আসছিল।
এ আটটি দলের সঙ্গে গত ২৮ ডিসেম্বর জোটে যুক্ত হয় আরো তিনটি দল। এলডিপি, এনসিপি এবং এবি পার্টি।
শেষ মুহূর্তে এসে এই তিনটি দল বিশেষ করে এনসিপি জোটে যুক্ত হওযায় নিজেদের কাঙ্খিত আসন না পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও ইসলামী আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। দলটি শেষ মুহূর্তে জোট ত্যাগ করতে পারে এমন আশঙ্কায় জোটে এনসিপিসহ তিন দলকে যুক্ত করে জামায়াত। যা ভালোভাবে নেয়নি ইসলামী আন্দোলন।
গত কয়েকদিনে দলগুলোর দফায় দফায় বৈঠকের পর ১১ দলের মধ্যে ১০টি দলে আসন সমঝোতা হলে বৃহস্পতিবার রাতে ১১ দলের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে সেটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে ১০ দলের নেতারা উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোন নেতা। তারপরও দলটির জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়।


