শ্রীপুরে মেয়ের প্রেম-বিয়েকে ‘অপহরণ’ সাজিয়ে বিএনপিকে জড়ান বাবা

শ্রীপুরে মেয়ের প্রেম-বিয়েকে ‘অপহরণ’ সাজিয়ে বিএনপিকে জড়ান বাবা
মাদ্রাসাছাত্রীকে নিয়ে যাচ্ছেন আবিদ। গত ১৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটের দিকে | ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া
Advertisement
Advertisement

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং রাজনৈতিক নেতাদের দাবি–বিষয়টি দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত হলেও একে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক রং দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, শ্রীপুর উপজেলা খেলাফত মজলিশের সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হাদিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে ঘর থেকে অপহরণ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তিনি কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হকের সহায়তা চান। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তার ফেসবুক স্ট্যাটাস ও বিবৃতিতে একে ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্বৃত্তপনা’ হিসেবে অভিহিত করলে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য ভিন্ন। শ্রীপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটি একটি প্রেমঘটিত বিষয়, যা পারিবারিকভাবে সমাধানযোগ্য ছিল। কিন্তু ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

তিনি জানান, আবিদের চাচা তার বন্ধু এবং তাদের পরিবার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে সভা করে ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানানো হবে।

ওই ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল হাসান রবি টাইমসকে বলেন, ‘আবিদ ও মেয়েটির বাড়ি সড়কের দুই পাশে। আবিদ ব্যবসা করেন এবং মাঝেমধ্যে কলেজে যান। তিনি বা তার পরিবারের কেউ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত–এমন কোনো প্রমাণ নেই।’

ঘটনাটিতে বিএনপিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

আরও পড়ুন

শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সদস্য শাহজাহান সজল টাইমসকে বলেন, ‘গত ১৫ এপ্রিল ইমামের ফোন পেয়ে তার বাসায় যাই। ইমাম আমাকে জানায়, ১৪ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে আবিদ তার মেয়েকে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় ১৫ এপ্রিল সকালে মেয়েকে বাসায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে দুপুরের পর আবিদ তার মেয়েকে নিজের স্ত্রী দাবি করে নিয়ে যেতে চাইলে ইমাম তা অস্বীকার করেন, কারণ মেয়ের বয়স ১৮ হয়নি এবং তিনি মেয়ের বিয়ে অন্যত্র দিতে চান।’

তিনি জানান, কিছুক্ষণ পর বাড়ি থেকে হইচই শুনে গিয়ে জানা যায়, আবিদ তার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দরজার তালা ভেঙে মেয়েটিকে নিয়ে গেছে। এ সময় ইমাম ও তার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়। পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও তারা আসার আগে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে, আবিদ বা তার পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এবং বিএনপিকে হেয় করতে এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, আবিদের বাসার ভাড়াটিয়া লিজা আক্তার টাইমসকে বলেন, ‘আবিদ ও ইমামের মেয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা এলাকায় পরিচিত। ঈদের সময় আবিদ মেয়েটিকে ৫ হাজার টাকার কেনাকাটা করে দেন। মেয়েটির মোবাইল না থাকায় তারা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। ১০ থেকে ১২ দিন আগে ২২ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল কিনে দেন আবিদ।’

তিনি দাবি করেন, পহেলা বৈশাখ তারা পালিয়ে গিয়ে নোটারির মাধ্যমে বিয়ে করেন। পরে বিয়ের বিষয়টি মেনে নেওয়ার কথা বলে মেয়েটিকে বাড়িতে এনে ঘরে আটকে রাখা হয়। মেয়েটি ফোনে বিষয়টি আবিদকে জানালে তিনি বন্ধুদের সহায়তায় তালা ভেঙে তাকে নিয়ে আসেন। তার মতে, এ ঘটনায় অপহরণ বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।

আবিদের বাসার ভাড়াটিয়া লিজা আক্তার ও খোদেজা বেগম জানান, আবিদ ও ওই তরুণীর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পহেলা বৈশাখ তারা পালিয়ে গিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়েটিকে তার বাবা বাসায় নিয়ে আটকে রাখলে মেয়েটি ফোনে আবিদকে উদ্ধারের আকুতি জানায়। এরপর আবিদ তার বন্ধুদের নিয়ে তালা ভেঙে মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। একে ‘অপহরণ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সদস্য শাহজাহান সজল ঘটনার দিন ইমামের বাসায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি টাইমসকে জানান, ইমাম হাদিউল ইসলাম তাকে বলেছিলেন, তিনি কোনো আলেমের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে চান এবং এই বিয়ে তিনি মানবেন না।

অভিযোগ উঠেছে, ইমাম হাদিউল ইতঃপূর্বে আর্থিক কেলেঙ্কারি ও পুলিশ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন এবং এলাকা ছেড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

তাদের দাবি, মেয়ের প্রেমঘটিত বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছেন এবং বিএনপিকে জড়িয়ে এলাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন।

এদিকে, পুলিশি অভিযান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা জানান, কোনো নারী পুলিশ ছাড়াই আবিদের নারী আত্মীয়স্বজন এবং মামলার আসামি নন এমন বৃদ্ধ ব্যক্তিদেরও পুলিশ টেনেহিঁচড়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর