প্রায় এক দশক ধরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হচ্ছে না। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার নিয়ম থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা থমকে আছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। এতে নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা। পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রমেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকার পর চলতি বছরে বিএনপি বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। বর্তমানে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক ধীরগতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন স্পষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন কাউন্সিল না হওয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে দল চালানোয় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। এরপর দশ বছর পার হলেও নতুন কাউন্সিল আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেই। দলের অভ্যন্তরে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। কেউ কেউ বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। অনেক সিনিয়র নেতা বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও। কোনো কোনো সংগঠনে তিন থেকে পাঁচ বছর, এমনকি এক যুগ ধরে একই কমিটি বহাল আছে। এর ফলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হচ্ছে। এতে সংগঠন তার স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে বলে কর্মীরা মনে করছেন।
বিএনপির নয়টি অঙ্গসংগঠন ও দুটি সহযোগী সংগঠনের প্রায় সবগুলোর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দলসহ অনেক সংগঠনেরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই।
ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের অবস্থাও নাজুক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আংশিক কমিটি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের নেতাদের মতে, এর ফলে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি নষ্ট হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, দীর্ঘদিন একই নেতৃত্ব বহাল থাকায় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ বাড়ছে। পদপ্রত্যাশী অনেক ত্যাগী নেতা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন না পেয়ে হতাশ হয়ে রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। দলের ভেতরে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে, যা তৃণমূলের সক্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয় কাজ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ ও বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি তিনি দলের সাংগঠনিক অবস্থা গোছানোর চেষ্টাও করছেন।
সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বড় অংশ এখন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত। স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টারা প্রশাসনিক কাজে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন আগের মতো প্রাণচঞ্চল নয়। এক সময় যা ছিল আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র, সেই ভবনটি এখন অনেকটাই নীরব।
তৃণমূলের কর্মীরা মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে দলের অন্য সিনিয়র নেতাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার।
অঙ্গসংগঠনগুলোর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। যুবদল দীর্ঘকাল ধরে আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে। ছাত্রদলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় পদবঞ্চিতদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। গত বছর ডাকসু ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ব্যর্থতার পেছনে এই সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কোন্দলকে দায়ী করা হয়।
শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি নেই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলেও একই পরিস্থিতি। অনেক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সরকারে যুক্ত হওয়ায় সেখানে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
দলের ভেতরে গ্রুপিং ও লবিং দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন পদ পেতে নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চললেও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা অবশ্য দাবি করছেন যে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিল হতে পারে। দলের অনেকে সরকারে যাওয়ায় সাংগঠনিক কাজে কিছুটা প্রভাব পড়লেও একে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে তিনি মনে করেন না।
অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি জানান, সরকার গঠনের পর সবাই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এর মধ্যেই সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। তবে কাউন্সিল চলতি বছর নাকি আগামী বছর হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সর্বশেষ আংশিক কমিটি হয়েছে ২০২৪ সালে। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় কার্যক্রমে ধীরগতি চলছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছে ২০১৪ সালের এপ্রিলে। অর্থাৎ দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সেখানে নতুন কমিটি নেই। বর্তমানে কমিটিতে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিম থাকলেও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস সংগঠনটির দেখভাল করছেন।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি হয়েছে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই। সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়নি।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি হয়েছে ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। এসএম জিলানী ও রাজিব আহসানের নেতৃত্বে থাকা এই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির ৩৭টি পদ শূন্য রয়েছে।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কমিটি হয়েছে ২০১৯ সালে। সভাপতি আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদিকা সুলতানা আহমেদের নেতৃত্বে সাত বছর ধরে একই কমিটি থাকায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে।
জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা বা জাসাসের আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে ২০২১ সালে। আহ্বায়ক হেলাল খান ও সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকনের নেতৃত্বে থাকা এই কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় কোন্দল চলছে।
জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের কমিটি ২০১৯ সালে ঘোষণার পর ২০২৪ সালে পুনর্গঠন করা হয়। সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহতাবের মৃত্যুর পর থেকে পদটি শূন্য আছে।
জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কমিটি হয়েছে ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর। সভাপতি হাসান জাফির তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল (বর্তমানে সংসদ সদস্য) এর নেতৃত্বে থাকা এই কমিটির মেয়াদও শেষ।
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কমিটি হয়েছে ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াজ আজিজ উলফাৎ ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের নেতৃত্বে এটি খুঁড়িয়ে চলছে।
জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল। বর্তমানে আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ও সদস্য সচিব মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের নতুন কমিটি থাকলেও তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি দ্রুত সংগঠন পুনর্গঠন না করলে বড় সংকটে পড়তে পারে। সরকারে থাকার সুবিধা নিয়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় তৃণমূলের এই হতাশা দীর্ঘমেয়াদে দলের রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।


