বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটি এখন দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জনপদটি তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আর শান্ত স্নিগ্ধতার জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
তেঁতুলিয়ার আকাশে যখন ভোরের সূর্য ওঠে, তখন দূর দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাচ্ছাদিত চূড়াটি সোনালি রঙে রাঙিয়ে ওঠে। অবশ্য এ দৃশ্য দেখতে হলে তেঁতুলিয়া যেতে হয় শরৎ কালে।
এছাড়াও সমতলের বিস্তীর্ণ চা–বাগান, স্বচ্ছ বয়ে চলা মহানন্দা নদী আর সীমান্তের ওপারে ভারতের চা–বাগানের সারি মিলে এখানে তৈরি হয়েছে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের ক্যানভাস।
পঞ্চগড় শহর থেকে খুব সকালে যাত্রা শুরু করলে এই অবারিত সৌন্দর্যের অবগাহন নেয়া সম্ভব। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। বাস কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে করে ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে মেখে রওনা দিলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছানো যায় তেঁতুলিয়ার প্রবেশদ্বারে। পথের দুই ধারের সবুজ প্রকৃতি আর পরিচ্ছন্ন রাস্তা পর্যটককে এক প্রশান্তিময় অনুভূতির জোগান দেয়।
তেঁতুলিয়া পৌঁছানোর পর সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হলো মহানন্দা নদীর পাড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ও পিকনিক স্পট। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই ডাকবাংলোটি একটি উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত, যেখান থেকে মহানন্দা নদীর গতিপথ এবং সীমান্তের ওপার স্পষ্ট দেখা যায়। এই ডাকবাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে শান্ত মহানন্দার প্রবাহ আর নদীর বুক থেকে পাথর উত্তোলনের কর্মব্যস্ত দৃশ্য পর্যটকদের মুহূর্তেই বিমোহিত করে। পিকনিক স্পটটি পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুযোগ–সুবিধা সম্বলিত করে সাজানো হয়েছে, যেখানে পরিবার–পরিজন নিয়ে কিছুটা সময় কাটানো কিংবা বনভোজনের আয়োজন করা যায়।

ডাকবাংলোর ঠিক নিচেই বয়ে চলা মহানন্দা নদীর তীর এখন এক নতুন রূপে সেজেছে। মহানন্দা পার্কের ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর শীতল বাতাসের ছোঁয়া নেয়া এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। নদীর ওপারে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া আর বিএসএফের টহল পোস্টগুলো মনে করিয়ে দেয় এটি একটি সীমান্ত জনপদ।
এখান থেকে মহানন্দার পাড় ধরে কিছুটা এগোলেই দেখা মিলবে পাথর শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের চিত্র। নদীর স্বচ্ছ পানিতে নেমে নুড়ি পাথর সংগ্রহের এই দৃশ্যটি কেবল তেঁতুলিয়াতেই দেখা সম্ভব। দুপুরের রোদে মহানন্দার বালুচরে জল আর পাথরের মিতালি এক ভিন্নধর্মী প্রাকৃতিক আবহ তৈরি করে যা আগত অতিথিদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।

ভ্রমণের মাঝপথে তেঁতুলিয়া সদর ও শালবাহান ইউনিয়নের সীমান্তে অবস্থিত নয়াকুরাটোল এলাকার ‘নোম্যানস ল্যান্ড‘ ঘুরে আসা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ৪৩৬ নম্বর মূল পিলারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে এখন ‘ছোট্ট ভারত‘ নামে সমধিক পরিচিত। এখানে দাঁড়ালে একদিকে দেখা যায় বাংলাদেশের শান্ত ও সবুজ গ্রামীণ প্রকৃতি, আর ঠিক পাশেই ভারতের সুবিন্যস্ত বিস্তীর্ণ চা–বাগান। সবুজে মোড়ানো এই সীমান্ত পথটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই পথে চলতে চলতে সীমান্তের ওপার দেখার সুযোগ পর্যটকদের কাছে যেন এক অপার্থিব প্রাপ্তি।
বিকেলের দিকে তেঁতুলিয়া ভ্রমণের পূর্ণতা পেতে হলে যেতে হবে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে। তেঁতুলিয়া সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানটি মূলত বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে বাণিজ্য বন্দর। এখানে নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে উঁচু ১৪০ ফুট উচ্চতার সুদৃশ্য পতাকাস্তম্ভ, যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা সগৌরবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়তে থাকে। জিরো পয়েন্টে বিজিবি ও বিএসএফের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ পর্যটকদের দেশপ্রেমের অনুভূতিকে জাগ্রত করে।

সীমান্তের জিরো পয়েন্ট গেট এবং চারদেশীয় বাণিজ্যের এই কেন্দ্রস্থলটি আধুনিক স্থাপত্য ও আলোকসজ্জায় এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে। সন্ধ্যায় সূর্যের আলো যখন পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন বাংলাবান্ধার আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ এক মায়াবী রূপ ধারণ করে।
প্রকৃতি, ইতিহাস আর আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় এই তেঁতুলিয়া। হিমালয়ের হিমশীতল পরশ, মহানন্দার স্বচ্ছ জল আর সীমান্তের ওপারের মিতালি পর্যটকদের মনে যে রেখাপাত করে, তা সত্যিই অমলিন। পঞ্চগড় শহর থেকে খুব সকালে যাত্রা শুরু করে সন্ধ্যায় ফিরে আসার এই সংক্ষিপ্ত অথচ বৈচিত্র্যময় সফর আপনার যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তির ছোঁয়া দেবে।


