পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে না হতেই মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার লেবুর বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উপজেলার যেসব এলাকা ‘লেবু গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত, সেখানেই এখন লেবুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
মাঠপর্যায়ের চাষিদের অভিযোগ, খুচরা বাজারে সাধারণ ক্রেতারা চড়ামূল্যে লেবু কিনলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারসাজিতে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকার ও মানভেদে খুচরা বাজারে প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও একই মানের লেবুর দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। পাইকারি বাজারে বর্তমানে এক হালি লেবু ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও একাধিক হাতবদলের পর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই দাম তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে ‘লেবু গ্রাম’ নামে পরিচিত বালিয়াখোড়া ও সোদঘাটা গ্রাম। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে লেবু বাগান আছে প্রায় ৬০টি। লেবু উৎপাদন ও বিপননে সরাসরি জড়িত এক হাজারেরও বেশি মানুষ।
এই এলাকায় মূলত কলম্বো, এলাচি ও কাগজি জাতের লেবু বেশি চাষ হয়। বাগান মালিকদের অভিযোগ, রমজানকে সামনে রেখে একটি চক্র দাদনের মাধ্যমে আগেভাগেই বাগান কিনে নেয়। ফলে মৌসুমের ভরা সময়ে বাজারদর বাড়লেও লাভের বড় অংশ চাষিদের পকেটে যায় না।
বালিয়াখোড়া গ্রামের বাগান মালিক আজিজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে ফলন কিছুটা কম হওয়ার পাশাপাশি সার, কীটনাশক ও পরিচর্যার খরচ অনেক বেড়েছে। রমজানে চাহিদা বাড়ায় বাজারে দাম বাড়লেও মাঠপর্যায়ে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে কিনে নিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে লেবু চাষের সঙ্গে যুক্ত একই গ্রামের চাষি প্রিতুল মিয়া জানান, তাদের ২০ বিঘা বাগান থেকে রমজানে লাভের আশা থাকলেও উৎপাদন খরচ বাড়ায় সেই আশায় গুড়ে বালি। বাজারে দাম বাড়লেও তারা কেবল খরচ তুলে বাগান টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করছেন।
অন্যদিকে, খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি তারা ইচ্ছা করে দাম বাড়াচ্ছেন না। তাদের বক্তব্য, বর্তমান সময়টি লেবুর ভরা মৌসুম নয়। পাইকারদের কাছ থেকেই তাদের চড়া দামে লেবু কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হওয়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
তবে সাধারণ ক্রেতাদের ধারণা ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, রমজান এলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইফতারের অপরিহার্য এই উপকরণের কৃত্রিম সংকট ও চাহিদা তৈরি করে পকেট কাটছে। এই অবস্থার অবসানে অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর বাজার তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ৩২৬ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হয়েছে, যার সিংহভাগই ঘিওর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর উপজেলায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার লেবু ঢাকার বড় বাজারগুলোতেও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু খোদ উৎপাদনস্থলেই দামের এমন আকাশচুম্বী উল্লম্ফন স্থানীয়দের হতাশ করেছে।
এ বিষয়ে ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, কাঁচাবাজারের কিছু পণ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজার মনিটরিং ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রমজানের শুরুতে লেবুর এই চড়া দাম অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রমজানজুড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।


