ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদ নিয়ে নতুন সরকারের নীতি কি হবে, তা জানার পর প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তিখাতে ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
মঙ্গলবার বেলা ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ‘গভর্নর জানিয়েছেন যে, বর্তমান নতুন সরকার আসার পর নগদের ব্যাপারে তাদের চূড়ান্ত নীতি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেবে, তবেই বিনিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
নগদ-এ বিদেশি বিনিয়োগ আনা নিয়ে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলা আলোচনার ধারাবাহিকতায় গভর্নরের সঙ্গে সভা করেন ব্যারিস্টার আরমান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আরমান।
সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একজন পেশাদার আইনজীবী। আমার আগেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবার এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এখন তাদের (বিনিয়োগকারি) জন্য কাজ করছি। তাদেরও আইনি সহায়তা দেবো।’
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারি হিসেবে নাম আসা প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ রয়েছে জানিয়ে আরমান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা মূলত বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে আগ্রহী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজছিলেন। আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার সময়ে আগ্রহের বিষয়টি জানিয়েছিলাম।’
নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না, তা জানতে তাদের পক্ষ থেকে একটি অডিট করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন গভর্নরকে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা স্বার্থের সংঘাত কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অন্তবর্তী সরকারের সময় থেকেই নগদে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে সরকারের সঙ্গে। আমি একজন উদ্যোক্তা পরিবারের সদস্য হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাকে বেছে নিয়েছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা কোনো স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে না। রাজনীতি করছি জনগণের সেবার জন্য, এখানে কোনো আয় নেই। দেশের জন্য কাজ করি। আর পরিবার চালানোর জন্য পেশা হিসেবে আইন চর্চা করি। যা ঐতিহাসিকভাবেই সংসদ সদস্যরা করে আসছেন। এখানে স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব নেই।’
বর্তমান সরকার দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে অত্যন্ত আন্তরিক মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অন্তবর্তী সরকারের সময় থেকেই নগদে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে সরকারের সঙ্গে।’
গভর্নরের সঙ্গে ব্যারিস্টার আরমানের বৈঠকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘নগদে ডিজাস্টার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে প্রশাসকসহ একটি টিম বসিয়েছে জনগণের স্বার্থে। প্রশাসক বসানোর পরে গত এক বছরে আর্থিক সূচকগুলোতে অনেক উন্নতি হয়েছে।’
‘যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে অনেক গ্রাহক জড়িয়ে গেছে। তাদের বেইজ তো অনেক বড় হয়েছে। এখন নগদকে যদি একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না হয়, তাহলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মনোপলি হয়ে যাবে। একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাবে।’
গত বছরে ব্যক্তিখাতে নগদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) একটি দরপত্র আহ্বান করে।
তাতে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৪টি প্রতিষ্ঠান সাড়া দিয়ে নগদে বিনিয়োগের প্রস্তাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একসঙ্গে সব উত্থাপন করা হবে জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, ‘নগদকে পুরোদমে সচল করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেটা দেশি-বিদেশি যে কেউ নিতে পারে। এখন যেহেতু নির্বাচিত সরকার এসেছে, নগদের মালিকানা ডাক বিভাগের। আর বিডাও সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই সরকারের অবস্থান জানার জন্য আমরা আরো একটু অপেক্ষা করব। সেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরই পরবর্তী পদক্ষেপে যাবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
আর্থিক খাতের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের চাপে বদলে যাওয়াটা দেশে ও বিদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নগদের মালিকানা সরকারি প্রতিষ্ঠানের। সরকার সিদ্ধান্ত নিবে তারা আগেরটি বহাল রাখবে- না কি নতুন কোনো প্রক্রিয়ায় যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এখানে সাচিবিক দায়িত্বটি পালন করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত সরকার জানাল সে অনুযায়ী কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
অডিট প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন বলেন, ‘অনিয়ম যা হয়েছে তা আইনি বিষয়। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে সরকার। যাই করা হোক, গ্রাহকের স্বার্থ ঠিক রেখে পুরো আইন মেনে করা হবে।’
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশ করেন। দুপুর ১২টার দিকে গভর্নরের সঙ্গে তার বৈঠক শুরু হয়।
গত বছরের ২৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নগদকে ডাক অধিদপ্তরের হাত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়া নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে নগদ। পরে এই এমএফএস কোম্পানিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সও দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ কোম্পানিকে নিয়ম ভেঙে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক বসায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে উচ্চ আদালত পরে তা অবৈধ ঘোষণা করে। তখন নগদের দায়িত্ব নেয় ডাক বিভাগ।
ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নগদের ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতিসহ আরও কিছু গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রশাসক দলের নজরে আসে।
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অভিযোগ করে বলেন, ‘নগদ ইজ স্ট্যাবিলাইজড অ্যান্ড গ্রোয়িং। এ প্রতিষ্ঠানের আগের মালিকানায় যারা ছিলেন, তারা নানা রকমের অনিয়ম করেছে। এজন্য অনেক জায়গায় কারেকশন করতে হয়েছে।’
কোনো প্রযুক্তি কোম্পানিকে নগদের প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন এমন একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যারা ধাপে ধাপে, শেয়ার ধরে ধরে নগদে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
এ সময় তিনি নগদকে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এরপর গত সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে গভর্নরকে চিঠি দেন আরমান। সেখানে নগদে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে জানিয়ে, বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নগদের ওপর পরিচালিত ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদন দিতে হবে বলেও জানান এই সংসদ সদস্য।


