ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা এবং নিউইয়র্কের আদালতে তার বিচার শুরুকে অন্য দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়, দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনভার নিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বৈদেশিক নীতিতে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বার্থ’ প্রাধান্য দিচ্ছেন। যেখানে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে অটল থাকতে এক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে দেওয়া হুমকি বাস্তবায়ন করতে কারাকাসে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রেসিডেনসিয়াল বাসভবনে নাটকীয় অভিযান চালিয়ে স্ত্রীসহ তাকে আটক করেছেন।
এর মাধ্যমে ১৮২৩ সালের ‘মনরো নীতিকে’ ফের সামনে এনেছেন ট্রাম্প। যেখানে পশ্চিম গোলার্ধের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো মূল্যে সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প সে নীতির নতুন নাম দিয়েছেন ‘ডনরো ডকট্রিন’।
তার মতে, যেসব দেশ মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানবে তাদের প্রতিহত করা হবে, এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও।
নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর আরও কয়েকটি দেশ ও সরকার প্রধানকে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প।
গ্রিনল্যান্ড
স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। পিটুফিক স্পেস বেইজ নামের ওই সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও তৃপ্ত নন ট্রাম্প। তার পুরো দ্বীপটিই চাই।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এই দ্বীপ এখন রাশিয়া ও চীনের জাহাজে ভরে আছে।’
ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপটি বিরল খনিজে সমৃদ্ধ। এসব খনিজ স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব বিরল খনিজ উৎপাদনে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক এগিয়ে।
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকে একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতে মেরু বরফ গলতে থাকলে এই অঞ্চলে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে মাদুরোর আদলে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে ‘কল্পনা’ বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, ‘আর কোনো চাপ নয়। আর কোনো ইঙ্গিত নয়। দখলের কল্পনাও নয়। আমরা সংলাপের জন্য উন্মুক্ত, আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। তবে তা অবশ্যই সঠিক প্রক্রিয়ায় এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে।’
কলম্বিয়া
ভেনেজুয়েলার অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ‘সাবধান থাকতে’ বলেন।
ভেনেজুয়েলার পশ্চিমের প্রতিবেশী কলম্বিয়াও তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ এবং স্বর্ণ, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লার অন্যতম বড় উৎপাদক। এই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক মাদক চক্রগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
মাদক বহনের অভিযোগে গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় ভেনেজুয়েলার নৌযানে হামলা শুরু করলে তার বিরোধিতা করেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রা। ক্রমেই ট্রাম্প সে দেশের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অভিযোগ করেন- তিনি কার্টেলগুলোকে ‘বিকশিত হতে দিচ্ছেন’।

ট্রাম্প বলেন, ‘কলম্বিয়া একজন অসুস্থ মানুষের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যিনি কোকেন বানাতে ও যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে ভালোবাসেন।’
তিনি পেত্রাকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘আর বেশিদিন এটা করতে পারবেন না।’ যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ায় কোনো অভিযান চালাবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অভিযানের কথা শুনতে তো ভালোই লাগে।’
ইরান
ইরানে বর্তমানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। তারই সুযোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। বিক্ষোভকারীদের দমনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসন বল প্রইয়োগ করায় হুঁশিয়ার করে ট্রাম্প বলেছেন, আর কোনো বিক্ষোভকারী নিহত হলে ইরানের কর্তৃপক্ষকে ‘চরম আঘাত করা হবে’।
রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি। তারা যদি অতীতের মতো মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করবে।’
ইরান তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রতিবেশী না হওয়ায় পররাষ্ট্র নীতি ‘ডনরো ডকট্রিনের’ আওতার বাইরে পড়ে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অটুট রাখতে পারমাণবিক শক্তিধর এই দেশের সঙ্গে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ অব্যাহত আছে।
গত সপ্তাহে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকেও প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইরান।
মেক্সিকো
২০১৬ সালে প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই দক্ষিণ সীমান্তে প্রতিবেশী মেক্সিকোর সঙ্গে বৈরিতার সৃষ্টি করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে টেক্সাস সীমান্তে ‘দেয়াল নির্মাণ’ শুরু করেন।
তার এই পদক্ষেপ ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিলেও ২০২৫ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে নিজের সেই অবস্থান ধরে রাখেন ট্রাম্প। প্রথম দিনেই তিনি একটি নির্বাহী আদেশে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ রাখেন।
তিনি বারবার দাবি করেন, মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অবৈধ অভিবাসীর প্রবেশ ঠেকাতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
গত রোববার তিনি বলেন, ‘মাদক মেক্সিকো দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে “ঢলে পড়ছে” এবং “আমাদের কিছু একটা করতেই হবে”। সেখানকার মাদক চক্রগুলো “খুব শক্তিশালী”।’
অবশ্য মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম প্রকাশ্যে মেক্সিকোর ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কিউবা
ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল (১৪৫ কিলোমিটার) দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখায় গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসে জর্জরিত দেশটি এবারও তারা যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প রোববার বলেন, ‘আমার মনে হয় না কিউবায় কোনো সামরিক অভিযানের প্রয়োজন আছে। মনে হচ্ছে দেশটি এরইমধ্যে ভেঙে পড়ছে।’
‘তারা টিকে থাকতে পারবে কি না জানি না, কিন্তু কিউবার এখন কোনো আয় নেই। তারা ভেনেজুয়েলা থেকে, ভেনেজুয়েলার তেল থেকেই সব আয় পেত’, যোগ করেন ট্রাম্প।
বিবিসির খবরে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা কিউবার প্রায় ৩০ শতাংশ তেলের জোগান দেয়। ফলে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশটির সরকার বড় ঝুঁকিতে পড়বে।


